আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর মানেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের উন্মাদনা আর তার সাথে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। আর এই বড় বাণিজ্যিক উৎসবকে ঘিরে মেক্সিকোর জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি নিয়ে সম্প্রতি এক বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল একটি চমৎকার এবং মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে। মেক্সিকোর একটি পোশাক প্রস্তুতকারক স্টার্ট-আপ সংস্থা 'সামওয়ান সামহোয়্যার' (Someone Somewhere) স্পোর্টস ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস (Adidas)-এর সাথে হাত মিলিয়ে মেক্সিকোর বিশ্বকাপ জার্সির একটি বিশেষ এবং সীমিত সংস্করণ (Limited Edition) তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। 

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল মেক্সিকোর আদিবাসী ও ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের তৈরি হাতের কাজকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। মধ্য মেক্সিকোর পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ১৫০ জন 'নাহুয়া' (Nahua) আদিবাসী সম্প্রদায়ের মহিলাদের এই বিশেষ জার্সিগুলোতে সম্পূর্ণ হাতে সুতোর কাজ বা এমব্রয়ডারি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফুটবল মাঠের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে আদিবাসী সংস্কৃতির এই মেলবন্ধনের গল্পটি প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এটিকে দেখা হচ্ছিল একটি বড় কর্পোরেট সংস্থায় প্রান্তিক মহিলাদের স্বাবলম্বী করার এক অনন্য নজির হিসেবে।

তবে, একটি বড় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই সুন্দর রূপকথার পেছনের এক অন্ধকার ও রূঢ় বাস্তব সামনে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রশ্ন তুলেছে, এই উদ্যোগটি সত্যিই আদিবাসী কারুশিল্পের সম্মান নাকি আসলে কর্পোরেট স্বার্থে প্রান্তিক মহিলাদের শ্রমের এক চরম শোষণ? খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যে কারিগররা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-রাত এক করে এই সূক্ষ্ম সুতোর কাজ ফুটিয়ে তুলছেন, তারা তাদের এই হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে অত্যন্ত নামমাত্র পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। যেখানে এই বিশেষ এবং সীমিত সংস্করণের জার্সিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত চড়া দামে বা প্রিমিয়াম মূল্যে বিক্রি হচ্ছে, সেখানে তার তুলনায় মূল কারিগরদের পকেটে যাচ্ছে সামান্য কিছু টাকা। 

এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মানবাধিকার মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বহু মানুষ অভিযোগ করছেন যে, বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো একদিকে নিজেদের 'সামাজিকভাবে সচেতন' বা 'পরিবেশবান্ধব' হিসেবে প্রচার করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে, আর অন্যদিকে যারা এই শিল্পের আসল রূপকার, সেই দরিদ্র গ্রামীণ মহিলাদের নামমাত্র মজুরি দিয়ে বঞ্চিত রাখছে। আপাতদৃষ্টিতে যা একটি অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগ বলে মনে হয়েছিল, তা এখন মেক্সিকোর আদিবাসী সংস্কৃতিকে পুঁজি করে বড় বড় কর্পোরেটদের সস্তা শ্রমের ফায়দা তোলার একটি বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ফুটবল ও ফ্যাশন বাণিজ্যের নৈতিকতা নিয়ে আবারও এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।