অভি চক্রবর্তী

তখনও সময় এত আত্মসর্বস্ব, জটিল, অন্তর্জালমগ্ন এবং উল্লাসপ্রবণ হয়ে ওঠেনি। তখন এক মানুষ আরেক মানুষের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটত, ছায়ায় ছায়ায় কথা হত তাদের। উদ্দ্যেশ্য-বিধেয়র তথাকথিত ব্যাকরণ না মেনেই এক মানুষ আরেক মানুষের জন্য তদ্বির করত। ঘুরে ঘুরে বেড়াত। আড্ডা মারত এক কাপ চা নিয়ে, অনেক্ষণ বসে বা দু'টো চা-কে তিনটে করে খেতো। অচেনা দরজায় টোকা দিয়ে খা-খা করা মধ্যদুপুরে জল চাইত গৃহকর্ত্রীর কাছে। আশ্চর্য হল এই জলের সঙ্গে টলও জুটে যেত তাজ্জব আতিথেয়তায়, বাৎসল্যের প্রাবল্যে। এমন এক হারিয়ে যাওয়া সময়ে, নভেন্দু সেনের নাটকের মাধ্যমে নাট্যমুখ পথ চলা শুরু করেছিল আজ থেকে ২৫ বছর আগে। বলা ভাল, শুরু হয়ে গিয়েছিল আজকের নাট্যমুখের কারুকৌশলের বীজবপন। সেই বীজের নাম নভেন্দু সেনের 'মল্লভূমি।' 

একটি বইয়ে সে নাটক পেলেও, নাটককারের সন্ধানে আমরা ছ'টি চরিত্র থুড়ি ছ'টি সদস্য ছানবিন শুরু করি তখন। বিস্ময়কর সংলাপের বুননে ততদিনে আমাদের মোহিত করে ফেলেছিলেন শ্রী সেন।  তখনও ক্ষ্যাপা পরশপাথর খুঁজে পেত, কারণ তখন প্রতিটি অন্বেষণের মধ্যে চাওয়া-পাওয়া, ধরা-করার মানসিকতা থাকত না। ফলত আমরা নভেন্দু দা-কে পেয়ে গেলাম। সোদপুরের বাড়িতে। এক বারবেলা ছোঁয়া ছোঁয়া আন্তরিক দুপুরে, তার ছাদের রোদ্দুরে। নভেন্দু দা পেলেন তার 'পাগলা'-কে। আদর করে একমাত্র নভেন্দু দা'ই এই নামে ডাকতেন আমাকে। আর কেউ ডাকেনি কখনও। বা ডাকলেও ছিনিয়ে নিয়েছে নিজেরা, কারণ থিয়েটারে ধ্বংসাত্মক নেশা ততদিনে আমাকে অ-প্রেমিক, অত্যাধিক নিয়মনিষ্ঠ, বিষাদগ্রস্ত এবং জীবন সম্পর্কে (পড়ুন রোজগার সম্পর্কে ) খানিক উদাসীন করে তুলেছিল। তাই এই পাগলা আর কয়েকজনকে নিয়ে 'মল্লভূমি'-এর যুদ্ধর সঙ্গে সঙ্গে শুরু করেছিল তাদের নাট্যপত্রিকার কাজকর্ম। 

নভেন্দু দা তাঁর কৃষ্ণঘন চশমা ফ্রেমের আবডালে তীক্ষ্ণ এবং  স্নেহপ্রিয় দৃষ্টি নিবন্ধ রেখেছিলেন আমাদের দিকে, আমাদের অপটু পরিকল্পনা, এলোমেলো কাজকে যেন গোছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সেই মধ্যবয়সী ভাস্কর, নাকি আমাদের মধ্যে দেখেছিলেন তারুণ্যের স্ফুলিঙ্গ যাকে খানিক অভিভাবকত্বের তাপ দেওয়া জরুরি! জানি না। কারণ সেসব আলোচনা যখন হতে পারত, তখনই নভেন্দু দা পাততাড়ি গুটিয়ে নিলেন, ইহলোকের সমস্ত ঝঞ্ঝা, জটিলতা, খেয়োখেয়ির এই অস্থির নাটমহল পেরিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন আক্ষরিক মহাপ্রস্থানের পথে...

যে কথা হচ্ছিল, নভেন্দু দা আমাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করলেন, ফোন করে বারংবার জানতে চাইলেন পত্রিকাটা নিয়ে আমরা কী চাই, কতোটা চাই? ল্যাংটার নেই বাটপারের ভয়! আমরা প্রায় নোবেল চাইয়ের আকাঙ্খা প্রকাশ করে ফেলেছিলাম বোধহয়, চুপ করে সদ্য যৌবনের আস্ফালন সহ্য করলেন। 

ছাত্রদলের সীমাবদ্ধতাও বুঝলেন। জানালেন,  'তোমাদের সাক্ষাৎকার বিভাগটা জোরাল হয়েছে।', আমাদের তো পড়ন্ত বিকেলেই হাতে কাস্তে! মার্কসের নয়। চাঁদের। যা আস্তে আস্তে ধারাল হচ্ছিল, ঐ যে প্রায় নিয়ম করে নভেন্দু সেনের বাড়ি যাওয়া, একই সঙ্গে আঁকা, লেখা, মঞ্চ, পোশাক, ভাস্কর্যে গ্রস্ত একজন অতি সাদামাটা যাপনপর্বের একজন মানুষকে দ্যাখা, তাকে ছুঁতে পারা...তাই ছিল আমাদের শান দেওয়ার পাথর। আমাদের নীল মাটি, আমাদের লাল কাঁকর। আমরা শিক্ষিত হচ্ছিলাম, চর্চার উৎস, ধরন এবং প্রয়োগ সম্পর্কে প্রথম সুনির্দিষ্ট পথে অবহিত হচ্ছিলাম। এমন সব দিন যাপনের পর্বে আকস্মিক নভেন্দু দা বললেন, 'শোন, আমি বাদলদার সঙ্গে কথা বলেছি। তোদের বিশেষ 'নাট্যকার ক্রোড়পত্র' সংখ্যায় আমরা বাদল সরকারের সাক্ষাৎকার রাখব। আমাদের চোখ চিকচিক করে উঠল, তারমধ্যেই মনে পড়ল আমাদের সেই অ‍্যান্টিক টেপ রেকর্ডারের কথা। তার গ্যারান্টি সে ছাড়া দিতে পারবে না কেউই। কখন রেকর্ড হবে, কখনোই বা তিনি ফিতে-টিতে জড়িয়ে আক্ষরিক জড় বস্তুতে পরিণত  হবে তা আমরা জানিনা কেউই। 

'কী করব?' শ্যাম রাখি না কূল রাখি? কিন্তু শাখের করাতের অবস্থা আমাদের। উচ্ছ্বাস বাইরে দ্বিগুণ বাড়িয়ে বললাম, 'উনি দেবেন?' নভেন্দু দা বললেন, 'দেবেন। আমি যাব তোদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটা আমিই নেব। তোরাও কিছু প্রশ্ন করিস।' পাঠক ভাবুন আজ থেকে বছর চব্বিশের আগে থিয়েটার করছি বলে বাড়িতে নিয়ত ধাতানি খাওয়া, এলাকায় সকাল-বিকেল অপমানিত হওয়া,  একজন সদ্য নাটক-পাগল ছেলে যদি শোনে তার সম্পাদিত নাট্য পত্রিকার, ক্রোড়পত্রের বিশেষ আকর্ষণ হতে যাচ্ছে মুখোমুখি 'নভেন্দু সেন-বাদল সরকার', তাহলে তার কী হতে পারে? শরীরের যাবতীয় শিরা-উপশিরা যেন তখন ঘুড়ির মাঞ্জা দেওয়া সুতোর শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সেই অভীষ্ট ক্ষণের দিকে ধাবিত হল...নভেন্দু দা জানালেন, 'আগামিকাল সকাল ১০টার পর ফোন করিস।', আমি বললাম 'ঠিকাছে।' বেরিয়ে আসছি, নভেন্দু দা বললেন, 'নম্বর নিয়ে যা।', আমি বলাম, 'কার?' নভেন্দু দা বললেন, 'কেন বাদল দার? ফোন করতে বললাম যে।' আমি আহাম্মক বনে যাই প্রায়, আটকে যাওয়া কথাকে ঠেলেঠুলে বাইরে আনি, 'আমি করব?' নভেন্দু দা বলেন, 'অবশ্যই।'

সেদিন বড়ি চলে এলাম।


আমি ভয়ে ভয়ে পরদিন সকালে, ল্যান্ডফোন তুলে, ডায়াল করলাম। রিং হওয়া শুরু হল। বুক দুরুদুরু বাড়তে লাগল আমার, বাদল সরকারকে কল করছি। একটা খিটখিটে কন্ঠস্বর হ্যালো বললেন, উল্টোদিকে আমিও ঈষৎ হোঁচট-টোচট খেয়ে বলে দিলাম,
- 'নমস্কার, বাদল সরকার আছেন?'
কন্ঠ- 'কে বলছেন?'

আমি- 'একটি পত্রিকা থেকে- ও ও- না- র একটা সাক্ষাৎকার নেব।'

কন্ঠ- 'না। উনি মারা গ্যাছেন।' (ফোন রেখে দেবার ঠাস শব্দ, কেটে যাবার চিকন মিউজ্যিকের রিপিটেশান বন্ধ করে আমি সঙ্গে সঙ্গে নভেন্দু দা কে আবার ফোন করি), নভেন্দু দা সব শুনে হাসতে হাসতে বলেন, 'আমার কথা হয়েছে পাগলা, তুই আমার নাম করেই বল। উনি পত্রিকা শুনলেই খেপে যান, আর এমনসব কথা বলেন।' আমি তো অবাক! নিজেই নিজের নামে একটা লোক বলছেন, মারা গিয়েছেন।

যা হোক আবার ফোন, এবারের কন্ঠস্বর অনেক মোলায়েম। আমি জানালাম সব নভেন্দু দার নাম করে। শুনে বললেন, 'বেশ এসো।' চাঁদ পাওয়া হাতে নভেন্দু দাকে ফোন করে সব বললাম। উদ্দিষ্ট দিনে আমি নভেন্দু দাকে নিয়ে, বলা ভাল নভেন্দু দা আমাকে নিয়ে পৌঁছলেন, ট্যাক্সি ভাড়া নভেন্দু দা'ই দিলেন। আমার কাছে, আমাদের পত্রিকার কাছে তখন ট্যাক্সি ভাড়া দেবার সাধ্য ছিল না। এসব মানুষের পরশ আমাকে সত্যিই ঋদ্ধ করেছে। আমরা পৌঁছালাম। বাদল সরকার এসে বসলেন, স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা। একেবারেই সামান্য বেশবাস। কিন্তু অসামান্য এক দ্যুতিময় ব্যক্তিত্বের জৌলুসে যেন ঘর ছেয়ে রইল। প্রথমেই বললেন, 'তোমাদের ছোট পত্রিকা তো?' 

 

 

আমি সম্মতি জানাতেই হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, 'আসলে তোমাদের ফোন আসবার আগেই একটি বড় কাগজ ইন্টারভিউর জন্য কল করছিল। তাদের বলে দিয়েছিলাম যে আমি মারা গিয়েছি, পরের ফোন ভাবলাম ওঁরাই করেছেন, তাই একই কথা বলি।' আমি নভেন্দু দা আর শ্যামল দা (ঘোষ) হো হো করে হেসে উঠলাম। লেখার নিজস্ব চলায় আর বলা হয়নি, সেটা হল- নভেন্দু দা'র অনুরোধে এই আড্ডায় ছিলেন, নক্ষত্র নাট্যগোষ্ঠীর শ্যামল ঘোষ। কারণ তিনি আর বাদল সরকার মিলে নক্ষত্র আর শতাব্দীর যৌথ প্রযোজনায় 'নয়ন কবীরের পালা' অভিনয় করেছিলেন, আকাদেমির তিন তলায়। ভাবতে এখনও আমার গা শিউরে ওঠে, নক্ষত্র শতাব্দীর যৌথ প্রযোজনা, নাটককার নভেন্দু সেন, দুই অভিনেতা শ্যামল ঘোষ-বাদল সরকার। সব্বাই উপস্থিত। আমি চুপ করে বসে আছি, থিয়েটারের এই ইনস্টিটিউশনের সামনে, কথা শুরু হল-আমি কলম বাগিয়ে লিখে চললাম দ্রুত। কারণ রেকর্ডার অ্যালাও করা যাবে না, এমনই ছিল বাদল দার প্রাথমিক শর্ত। 

সেদিনের আলোচনার অধিকাংশই বাদল দার কাজ, শতাব্দীর শুরু, বর্তমান অবস্থা এসব নিয়েই হয়েছিল। সেসব কথাবার্তার সামগ্রিক সংশ্লেষে প্রকাশ পেয়েছিল গভীর বেদনা, খানিকটা হতাশাও। নতুন প্রজন্মের এই থিয়েটারের সঙ্গে মিশতে না পারার চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে বুঝতে পারছিলাম। আজ আরও পারি। থিয়োজাফিক্যাল সোস্যাইটি ছাড়া কোথাও থার্ড থিয়েটারকে বা অঙ্গন নাট্যকে প্রকাশ করবার সঠিক জায়গা পেলেন না, নিজস্ব কোনও ক্ষেত্র এই থিয়েটারের তৈরি হল না। সত্তর ছুঁই ছুঁই বৃদ্ধের সেদিনের হাহাকার আজও আমি যেন স্পষ্ট শুনতে পাই, মাঝে মাঝে ভাবি যদি আজকের বাংলায় তিনি থাকতেন তবে হয়ত বাংলা জুড়ে তৈরি হওয়া অফ- প্রসেনিয়াম নাট্যক্ষেত্রগুলি অবলোকন করে খানিক শান্তি পেতেন। 

কথাবার্তায় উঠে এল 'এবং ইন্দ্রজিৎ'-এর মতো প্রসেনিয়াম থিয়েটারের মোড় ঘোরানো নাটকের কথা। কী ভাবে তা বহুরূপী নিয়ে, শুধু মহলা করে ফেলে রেখেছিল বা পরে শৌভনিকের প্রযোজনা যে একেবারেই তার না-পসন্দ ছিল, সেসব কথায় অকপট ছিলেন সেদিন তিনি। 'মুক্তমেলা', 'মিছিল', 'ভোমা'-এর মতো থার্ড থিয়েটারের গুরুত্বপূর্ণ নাট্যের কথা আবার মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের 'ক্যাপ্টেন হুররা' প্রসঙ্গও বলে চললেন। স্পষ্ট জানালেন মোহিত বাবু এ নাটক তাঁকে না করতেই বলেছিলেন, 'ওঁচা' বলেছিলেন নিজের লেখাকেই। কিন্তু সামান্য কিছু অদলবদলে এ নাটকের নাট্যায়নে মুগ্ধ হন মোহিত বাবু। বাদল দার কাছে চাওয়া সময় ফুরিয়ে আসছিল, হঠাৎ নভেন্দু দা বললেন, বেলঘড়িয়া এথিকের তৎকালীন সময়ে প্যারীমোহন লাইব্রেরিতে নিয়মিত থিয়েটার করবার কথা। একটা ঘরের মধ্যে থিয়েটার। বাদল দাকে খানিক চনমনে লাগল, যেন আনন্দের শিশির চকচক করে ওঠে। ভবিষ্যৎ এর মধ্যে যেন আগামীর রসদ খুঁজে পান তিনি। নভেন্দু দা, আমি সব্বাই মিলে আরেকটি তারিখ চেয়ে নি তাঁর, বাদল দাই জানান দ্বিতীয় দিনের আলোচ্য বিষয় হবে তাঁর কর্মশালা। তার নাট্যকর্মী গড়ে তোলার বহুশ্রুত পদ্ধতি। আমি দ্বিগুণ উৎসাহে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ভাঁড়ে চা খেতে খেতে আমরা ভাবছিলাম...বাদল সরকার...থার্ড থিয়েটার...অঙ্গন নাট্য এবং অবশ্যই বাঙালির তথাকথিত রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কাঁকড়া প্রবৃত্তির কথা।

বাদল সরকারের কর্মশালার ব্যপ্তি পরিধি এবং প্রক্রিয়া সুবিশাল। প্রথমেই বাদল দা জানালেন পদ্ধতির প্রাথমিক স্কেচটি তাঁর বিদেশ থেকে শেখা, জানা। পরবর্তীকালে তিনি তাকে আমাদের জল হাওয়ায় সংশ্লেষিত করেছেন। নানান সংযোগ- বিয়োগের মধ্যে দিয়ে। একত্রে প্রথমে শিক্ষার্থীরা বসে বা দাঁড়িয়ে পরস্পরের হাত ধরে নিজস্ব সমস্ত ভাল যা কিছু, তা অন্যের হাতে সঞ্চারিত করেন। এইভাবে প্রথমেই তিনি তৈরি করে নেন এক আশ্চর্য ধন্বাত্মক শৃঙ্খলা যা একটি সমষ্টিগত কাজের পক্ষে শুধু  প্রয়োজনীয় নয়, অবশ্য পালনীয়। আমার মনে পড়ে যায় কিছু না জেনেই আমরা এই ওয়ার্কশপ পদ্ধতি ফলো করতাম আমাদের শুরুর দিকের নির্দেশকদের নির্দেশে। 

তারপর তিনি পরপর বললেন মিরর গেমের কথা, সেখান থেকে জয়েন্ট মিররিং-এর কথা। ট্রাস্ট গেমের মজা এবং ছাত্রছাত্রীদের পরিবর্তিত হয়ে যাবার কথা। এসব গেমের প্রয়োগ থেকে মূলত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিয়োগের প্রক্রিয়াকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন তিনি। সহসা চমক লাগতে পারে। এ কি! বিয়োগ! আমাদেরও লেগেছিল। বাদল দা তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে বললেন, ছোট থেকে আমরা শুধুই আমাদের নিজেদের উপর চাপাই। নানান নীতি, উপদেশ, ধরন চাপাই। বড়রা যা বলে তেমন তেমন হয়ে উঠতে উঠতে আমাদের ভিতরের অরিজিনটা হারিয়ে যায় আস্তে আস্তে। কথাটার সত্যতাটা যে কী প্রবল তা হাড়ে-মজ্জায় আমরা বুঝতে বুঝতে যাই আজীবন। সেখানেই এই ওয়ার্কশপের মূল কথা, যে তুমি তোমার নিজের ভিতরে তাকাও। কষ্ট হবে। অসুবিধে হবে।  নানান ইনিহিবিশান ঘিরে ধরবে, তবুও তাকাও। তাহলেই একমাত্র খোলসহীন একজন অভিনেতা তৈরি হওয়া সম্ভব। নইলে নকল, অনুকরণের মধ্যেই অভিনেতার জন্ম- মৃত্যু ঘটতে থাকবে। আমরা হতবাক হলাম, ভাবলাম আদৌ কি সম্ভব সামাজিক ট্যাবু খসিয়ে এই জায়গায় এই সাধনায় পৌঁছনো? আজ শতবর্ষে এসে ভাবি, দেশ- বিদেশ জুড়ে বাদল দার এই বিখ্যাত ট্রেনিং পদ্ধতিতে যারা কাজ করেছেন তারা নিশ্চয়ই এই পরম আকাঙ্খিত ধ্রুবতারার সন্ধান পেয়েছেন। পেয়েছেনই। 

আর একটি জরুরি কথা সেদিন বাদল দা বলেছিলেন তাঁর ওয়ার্কশপ প্রসঙ্গে, যে তিনি কোনও অবসারভার রাখতে দেবেন না। অর্থাৎ যারা ইনহাউস থাকবেন তাঁদের সব্বাইকেই অংশগ্রহণ করতে হবে। না হলে পর্যবেক্ষকের এই চোখ অংশগ্রহণকারীদের জন্য আনসেফ হয়ে উঠতে পারে। তখন যা বুঝেছিলাম, পরে বারংবার তা বেশি করে বুঝেছি যে কী করে মহলায় সামান্য কাঠের মিস্ত্রিও কারওর সঙ্গীত, কারওর নৃত্য নিয়ে অবলীলায় কথা বলে যান। বুঝতাম তাঁর পড়াশুনো আছে, দেখার এক তেপান্তর আছে তাও হত, কিন্তু শূন্য পকেটে তিনি জানান দেন তার উপস্থিতি। আসলে ঐ যে, তিনি তো সেফ! তাই যারা মিথ্যের খোলস ছাড়িয়ে একটা সৎ শিল্পের অংশীদার হয়ে উঠতে চাইছে, তিনি আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। তৃতীয় ব্যক্তি যেমন সমস্ত ব্যাপারেই সমস্যার, তেমনই এক্ষেত্রেও অনথ্যা হয় না। এই সরল সত্যটা কী অনায়াসে সেদিন আমাদের বলে দিয়েছিলেন এই আত্মবিশ্বাসী তরুণ। 

জানি না, বাদল সরকারের কর্মশালা সংক্রান্ত কতটা হদিশ আমি পাঠকবর্গের জন্য রাখতে পারলাম, জানি না থিয়েটারের বাইরের পাঠকদের এতে লাভ হবে কী না! কিন্তু এমন কোনও অমল যদি থাকে যার কল্পনা বাস্তবের অধিক বা এমন কোনও নন্দিনী যদি থাকে আজ যার গান বিদ্রোহের অধিক তবে নিশ্চয়ই তাঁরা এই কর্মশালার মর্মমূল ছুঁয়ে থাকতে পারবেন। আমি পরবর্তীকালে বইপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে দেখেছি বাদল সরকার আসলে আমাদের আরেক ব্যতিক্রমী নাট্যপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই আধুনিক স্বর, যিনি অনেক আগেই বলেছিলেন, 'চিত্রপট নয়, চিত্তপটের প্রয়োজন।'