সৈকত মজুমদার: প্রিয় লিওনেল আন্দ্রেজ মেসি- তোমার কাছে এই চিঠি কোনওদিন পৌঁছবে না জেনেও লিখতে বসলাম। কেন লিখছি জানো? দেখলাম সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবল শিল্পী হয়েও তুমি আমাদের মত সাধারণ মানুষ হয়েই থেকে গেলে।


সমাজমাধ্যমের আগ্রাসী ও নির্বোধ মন্তব্যের জোয়ার যাই বলুক না কেন, চল্লিশ বছর ধরে ফুটবল দেখা আর পনেরো বছর ক্রীড়া সাংবাদিকতা করা এক মধ্য পঞ্চাশের দর্শকের কাছে তুমিই এই বিশ্বকাপের সেরা। এই দল নিয়ে যে তোমার দেশ  বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে পারে সেটা গোটা দুনিয়াকে বিশ্বাস করতে বাধ্য  করেছ তুমি। সেরার শিরোপা তোমার জোটেনি। দেশকে চ্যাম্পিয়ন করার পুরস্কার হিসেবে গোল্ডেন বল পেয়েছেন রড্রি। তা নিয়ে আমার কোন দুঃখ নেই। 


আমার সমস্যা তোমাকে নিয়েই, বা বলা ভাল তোমার আচরণ নিয়ে। সেমিফাইনালের পর মাঠে তোমার সতীর্থরা যখন রাজনৈতিক টিফো তুলে ধরল, তুমি তাদের বারণ করোনি। মনে করিয়ে দাওনি অনেক সময় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এটা নিয়মবিরুদ্ধ। তোমাদের আবেগকে আমি সমর্থন করি, আচরণকে নয়। ফিফা তোমাদের শাস্তি দেয়নি তার মূল কারণ ব্যবসায়িক। কিন্তু তুমিতো মেসি! মাঠের বাইরেও তোমার দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। সমালোচকদের হাতে তুমি অস্ত্র তুলে দিলে তোমাকে ফিফার বরপুত্র বলে দাগিয়ে দেওয়ার, যেটা তোমার একেবারেই প্রাপ্য নয়।

এখানেই শেষ নয়। আরও বড় ভুল করলে রবিবার ফাইনালের পর। মানছি জীবনের সম্ভবতঃ শেষ বিশ্বকাপ ফাইনালে জঘন্য খেলে হেরে যাওয়ার পর তুমি একটু বেশিই ভেঙে পড়েছিলে। তবু তোমার উচিৎ ছিল না কি স্পোর্টসম্যানশিপ দেখানো ? স্পেনের ফুটবলারদের হাতে যখন কাপ তুলে দেওয়া হচ্ছে তখন তোমরা সেদিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকলে? তুমি  তো মেসি! তোমার জন্য তোমার টিম না কি জান দিতেও রাজি ? তুমি তাদের ডাকলে না হাততালি দিয়ে রড্রিদের অভিনন্দন জানাতে ! যোগ্য বিজয়ীদের সম্মান জানালে তোমরাও সম্মানিত হতে। 

তোমার জ্যোতিষ্কর মত উজ্জ্বল রেকর্ড আরও কালিমালিপ্ত হল ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার পর যখন তোমার সতীর্থ প্যারাডেস পাড়ার মাস্তানদের ভঙ্গিতে চড়াও হল স্পেনের গাভির উপর। তখনও তুমি কোথায়? যে দেশের অ্যাকাডেমি থেকে তোমার উত্থান, যে দেশের একাধিক ফুটবলার বিভিন্ন সময়ে তোমার সহযোদ্ধা ছিল, তাদের অপমান দেখেও তুমি মুখ ফিরিয়ে থাকলে! চোখের জলে কি সব এতটাই ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল যে নিজেদের সম্মানহানিও তোমার চোখে পড়ল না ! না লিও, এটা তোমার কাছ থেকে আশা করি নি। তুমি যে মেসি! তোমার মহান পূর্বসূরীর মতো তোমার নামের পাশেতো কোনও কালো দাগ ছিল না। নিছক ফুটবল জাদু আর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাতেই তুমি বিশ্বসেরা।


তাহলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়লগ্নে এই গ্রহণ লাগতে দিলে কেন ? তাহলে তুমিও কি আমাদের মতই সাধারণ?  তাতো তুমি নও! চ্যাম্পিয়নের মুকুট এবার তোমার মাথায় ওঠে নি ঠিকই, কিন্তু তাতে তোমার এতদিনের কীর্তি ম্লান হয়ে যায় না। আমার কাছে তুমি সর্বকালের সেরা। যারা তোমাকে সমালোচনা করবে বলেই করে, তারাও তোমাকে অন্ততঃ অন্যতম সেরা বলে মানতে বাধ্য হয়।

রবিবার সন্ধ্যায় তোমার সুযোগ ছিল ফুটবলেরও ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে একজন সত্যিকারের মহাতারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।  কেন সেটা করলে না লিও !

তোমার ফ্যানদের এই আক্ষেপ থেকেই যাবে।

ভাল থেকো। ফুটবলেই থেকো। 

                                                                                         ইতি - তোমার এক গুণমুগ্ধ।