যন্তর-মন্তর থেকে
উদ্দালক
মনে পড়ছিল কিশোর কুমারের গান, 'এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায়, স্বপ্ন মধুর মোহে...' যন্তর মন্তরের ভাঙা মেলায় এসে সাংবাদিক মন খুঁজছিল কোনও একটা সূত্র। এমন কী আছে, যা টেনে আনল লাখো-লাখো মানুষকে। শুধু বিদেশি ফান্ডিং বা উস্কানিতে তো এমন হাজার-হাজার মানুষ আসে না, আসে কিসের টানে? বিজেপি বিরোধী মানুষের কাছে এই শেষ দেড় মাসের ভারত যেন খোলা মাঠ। যেখানে যেভাবে খুশি দৌড়ে বেড়ানো যায়। কিন্তু আসলে, এর পিছনে রয়েছে বেশ কয়েকটা সূত্র। অকুস্থলে এসে অন্তত তেমনই মনে হল। এই লেখা আমি যখন লিখছি, তখন ২৫ জুলাই পেরিয়ে, ২৬-এ জুলাইয়ে পৌঁছে গিয়েছে সময়। শনিবার দুপুরে হঠাৎ ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর এসেছে। সে খবর হজম করতে লেগেছে ঘণ্টাখানেক। তারপর কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সিজেপি-এর মিটিং, শেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই কার্নিভালসুলভ আন্দোলন শেষ হয়েছে। কিন্তু তারপরেও, রাত প্রায় সাড়ে দশটা পর্যন্ত, যন্তর মন্তরে লোকের ভিড় ছিল উপচে পড়ার মতো। চারিদিকে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে নাচ-গান থেকে দড়ি টানাটানি খেলা, যেন এতদিনের লড়াইয়ের পরেও শরীরে অফুরন্ত শক্তি। যদি সত্যি বিজেপি বিরোধিতার এত তাগদ হয়, তা হলে তা ছিল কোথায়, কেন হুট করে তা প্রকাশিত হল এবং এমন একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটিয়ে দিল। এমন করে প্রায় সবকটা বিরোধী তির শেষ কবে ঠিক জায়গায় লেগেছে, বলা মুশকিল।
আসলে, শূন্যস্থান। প্রকৃত বিজেপি বিরোধীর মুখের অভাব। যে বিরোধীর গায়ে দুর্নীতির কালি নেই, যে বিরোধীর গায়ে কোনও দাগ নেই, তেমন লোক খুঁজে পাচ্ছিল না মানুষ। সেই স্বর খুঁজে পেয়েছে আরশোলাদের দঙ্গলে। কিন্তু সেই আরশোলাদের আন্দোলনের শুদ্ধ আবেগ শেষ পর্যন্ত শুদ্ধ থাকবে তো? এক নাগাড়ে শেষ কয়েকদিনের ছবি দেখা যাক। সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ জানিয়েছিলেন, দেশের সমস্ত দলকে এই আন্দোলনে সামিল হতে আহ্ববান জানিয়েছিলেন তাঁরা। সেই ডাকে প্রথমদিকে কেউ সাড়া দেননি, বলা চলে পাত্তা দেননি। কিন্তু ক্রমে জল গরম হতেই একে একে সংসদীয় দলের নেতানেত্রীরা হাজির হয়েছেন। অখিলেশ, ডিম্পল, মেহবুবা মুফতি, কেজরিওয়াল, মহুয়া মৈত্র, মমতারও যাওয়ার কথা পাকা ছিল, কিন্তু তার আগেই আন্দোলন মিটে গেল, তাই তার আর যাওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, জেনজি আন্দোলনের নৌকায় চড়ে সংসদেও রাজনীতির তাপ বাড়াতে শুরু করে বিরোধীরা। সকলেরই, দফা এক, দাবি এক, ধর্মেন্দ্রর পদত্যাগ। সিজেপির স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরোধীদের স্লোগান। ভাড়া করেছেন তাঁরা।
কেন স্লোগান ভাড়া করতে হয় প্রথমসারির রাজনৈতিক দলগুলোকে। বামেরা ছাড়া এই আন্দোলনের প্রত্যেকে বহিরাগত। তাঁদের অক্সিজেন জোগানোর কাজ করেছে এই আন্দোলন। ভরা সাগরে খড়কুটোর মতো আন্দোলনে ভর করে সংসদীয় রাজনীতিতে ধার বাড়াতে চেষ্টা করেছেন বিরোধীরা। কেন? ইস্যু তো সামনে পড়েই ছিল, দেখতে পেয়েও মানুষকে জড়ো করতে পারলেন না কেন তাঁরা? কারণ, বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব। মানুষের প্রথাগত রাজনৈতিক দলের কাঠামো ও নেতৃত্বেক প্রতি আর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। তাঁরা নতুন কিছু চান। আর সেই নতুনের পথ ধরেই এসেছে সিজেপি, মানুষ আবারও বিশ্বাস করেছে। কিন্তু সিজেপির সাজানো বাগানের ফুল তুলে নিজের ফুলদানি সাজানোর ফর্মুলা আদৌ কংগ্রেস, সপা বা বামেদের ডিভিডেন্ট দেবে কী না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
আপাতত দিল্লি শান্ত। সব রাস্তা খুলে গিয়েছে। রবিবার থেকে মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক হবে। কয়েকটি রাজনৈতিক কর্মসূচি আফটারশকের মতো চলবে কয়েকদিন। কিন্তু তারপর? বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির বেশিরভাগ দুর্নীতি ও বিশ্বাসঘাতকতার দীর্ঘ অতীত নিয়ে এই লড়াইকে আদৌ ভোটের লড়াইয়ে নিয়ে যেতে পারবে কী না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। অন্যের নৌকায় পা দিয়ে চলার চেয়ে, এতদিনে যদি নিজের নৌকার ফুটো সারাতেন ওঁরা, তা হলে ফল অন্যরকম তাও হতে পারত, না হলে অচিরেই দেওয়াল লিখন মিলিয়ে যাবে। ইনস্টাগ্রাম দিয়ে যতটা সম্ভব ওরা করেছেন। বাকিরা মধু খেয়ে চুপ করে বসে থাকলে, আবারও ভোটের পর বিরোধী দলনেতাকে পালাতে হবে ইউরোপে, ছুটি কাটাতে।
















