উদ্দালক 

পল সাইমন নামে একটা লোক গান লিখলেন। সাউন্ড অফ সাইলেন্স। অন্ধ বন্ধু স্ট্যানফোর্ড গ্রিনবার্গ বহুবছর পর লিখবেন, সাইমন তাঁর রুমমেট ছিলেন। অন্ধ ও চক্ষুষ্মানের বন্ধুত্বকে এই কালজয়ী কাব্য লিখে গিয়েছেন সাইমন। অর্পিতা ঘোষের নির্দেশনায় ও রূপান্তরে পঞ্চম বৈদিকের 'রাজনৈতিক হত্যা?'-র একদম শেষ দৃশ্যে এই সুর কয়েক মুহূর্তের জন্য যখন বাজে, তখন মনে হয় বিশ্বাসঘাতকতা, ভালবাসা, সূক্ষ্ম ভরসা আর রাজনীতি, এই সমস্ত লড়াইয়ের পাশেও শেষ পর্যন্ত পড়ে থাকে এক নির্জন, একা মানুষের লড়াইয়ের গল্প। যে গল্পে কখনও তাৎমাটুলির‌ ঢোঁড়াই হেটে যায়, উইঙ্কিল টুইঙ্কলের সব্যসাচী হেঁটে যান, মিলিয়ে যান ইতিহাসের উল্লেখ না করা অধ্যায়ে, যেখানে আলো পড়ে না সাধারণত। কখনওসখনও শীতের বিকেলের মরা আলো এসে পড়ে। আর সেই আলোয় দেখা যায় সেই নায়ককে, যে বসে আছে, আর সভ্যতার শেষ পর্যন্ত হিসেব করে চলেছে, ভেবে চলেছে, যারা ছেড়ে গেল, কেন গেল? শুধু ক্ষমতা? না, না, তা নয়, শুধু ক্ষমতার জন্য মানুষ ভালবাসা ছেড়ে যায় না, নাকি যায়? এই হিসেবের নেপথ্যে ভেসে ওঠে অন্ধ বন্ধুর সঙ্গে চিরকাল থাকার শপথপত্র, যা বলে নৈঃশব্দের কথা। মিলিয়ে যায় চিরন্তন কুয়াশায়। 


কোথাও কোথাও লেখা আছে, কেনেডির মৃত্যুর পর এই গান লিখেছিলেন সাইমন। সেই রাজনৈতিক অনুষঙ্গে নাটকের শেষে পরিচালক অর্পিতা ঘোষ যদি এই গান ব্যবহার করে থাকেন, তা হলেও আমি এই গানের রাজনৈতিক প্রয়োগ মানতে নারাজ। বরং একে আমি ব্যক্তির গান হিসাবেই দেখতে চাই। দেখতে চাই সম্পর্কের গান হিসাবে, যে সম্পর্কের গান নৈঃশব্দের কথা বলে, চুপ করে থেকে অন্তরের অনুভব আর বিশ্বাসের কথা বলে।

সার্ত্রের এই নাটকটি প্রথমবার অভিনীত হয় ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে। পূর্ব ইউরোপের ইলিরিয়া দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, ছাড়াও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এই নাটক লেখা। ঘটনা বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে আবর্তিত। উল্লেখ্য, শেক্সপিয়ারের একটি নাটকে এই প্রদেশের কথা আছে, বলুন তো, কোন নাটকের কথা বলছি? সে যাক গে। নাটকের কেন্দ্রে হুগো চরিত্রটি আছে। তার জীবনের ঘটনাবলীকে ঘিরে রয়েছেন বাকিরা, ওলগা, জেসিকা বা হোয়েডেরাররা। তিন ঘণ্টার বিস্তৃত পরিসরের এই নাটক পঞ্চম বৈদিক প্রথমবার মঞ্চস্থ করেছিল ২০০৪ সালে। তখন আমি এই নাটক দেখিনি। ভারতের রাজনীতিতে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বামেদের সরকারে থাকা, বা না থাকা, থেকেও সরকারের সমালোচনা করার প্রসঙ্গ এখানে এসেছে। পাশাপাশি, বামেদের উদারনীতি ঠিক কতটা উদার, উদার হতে হতে শেষ পর্যন্ত কতটা কংগ্রেসের কাছাকাছি যেতে পারে, কতটা একসময়ের ভয়ানক শত্রুদের হাত ধরতে পারে, এসব সমালোচনা এখানে এসেছে। সে সব প্রসঙ্গ রাজনৈতিক ইতিহাস জানলে খানিক বোঝা যায় হয়ত, কিন্তু না জানলেও অসুবিধা নেই। বরং না জানলে এক চমৎকার ফ্রেশ বা তাজা বিশ্লেষণ নিয়ে দর্শক আসন ছাড়বেন সে কথা বলা চলে।

এই নাটকে চমৎকার অভিনয় করেছেন সকলেই। অর্ণ মুখোপাধ্যায়, বাবু দত্তরায়, তূর্ণা দাশ, অর্পিতা ঘোষ, দেবকমল মণ্ডল, অনির্বাণ রায়চৌধুরী, অভ্র মুখোপাধ্যায়-সহ প্রত্যেকেই এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েও কোথাও সামান্য স্খলিত হননি। আসলে শিল্পী হিসাবে এদের দক্ষতা বা স্কিল এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দেখে ঈর্শ্বা হয়। তিনঘণ্টার নাটকে দীর্ঘক্ষণ দর্শককে বিশ্বাসযোগ্য করে বসিয়ে রাখা, সামান্যতম একঘেয়েমির সুযোগ না দেওয়া, ফাটকাবাজির সময়ে বিশ্বাস ফিরে আসে এই নাটক দেখে। বিশ্বাস হয়, না, এখনও কথার দাম আছে, এখনও মানুষ প্রাথমিকভাবে মঞ্চে দেখতে আসে তারই মতো রক্ত মাংসের অন্য একটা মানুষকে। তার হাঁটাচলা, কেঁপে ওঠা, চোখ তুলে চাওয়া বা বিশ্বাসঘাতকতায় হাত কাঁপা দেখেই মানুষের মন নেচে ওঠে।

নাটকের নির্দেশক, লেখক ও অভিনেতা অর্পিতা ঘোষের কৃৎকৌশল আলাদা করে তাঁকে আত্মার মতো প্রতিষ্ঠা করেছে এই নাটকে। তিনি অভিনয় করছেন, অভিনেতা অর্পিতার পাশাপাশি মঞ্চজুড়ে ভেসে বেড়ান নির্দেশক অর্পিতাও। তাঁকে আলাদা করে চোখে পড়ে। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তুর্ণার পাশে, হাফ টাইমের স্লো মোশনে। নাটকের আলোক পরিকল্পনা করেছেন দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। আচ্ছা, কেন বারংবার শিলুয়্যেট তৈরি করলেন তিনি? আলো উল্টো দিক থেকে এলে যে আঁধার তৈরি হয়, তার রাজনীতি কী? উল্টো আলোর রাজনীতি কী? ভাবাচ্ছে, এই নাটকের প্রতিটি দর্শককেও হয়ত তাই ভাবাচ্ছে। আর গোটা মঞ্চের আলোর বাইরে যখন একজনকে বিম লাইটের স্বল্প পরিসরে একই প্লেনে এনে দাঁড় করাচ্ছি, তখন সে হঠাৎ আলাদা হয়ে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে ভিন্ন বৃত্তে। দেবেশ বারংবার অবাক করেছেন, এবারেও সেই রকম করে অবাক করেছেন। ছায়া, আলো, অন্ধকারে পূর্ব ইউরোপের দেশের কনকনে, ম্যাট ফিনিশ এক আবহাওয়া তৈরি করেছেন তিনি নৈপুণ্যে।

জার্মান আমি জানি না। সার্ত্রের এই নাটকের ইংরাজি অনুবাদ ডার্টি হ্যান্ড-এ হুগোর একটি ডায়লগ লেখা হয়েছিল ‘ আই কিল্ড হিম, বিকজ আই ওপেন্ড দ্যা ডোর।’ দরজাটা খুলেছিলাম বলে আমি ওকে হত্যা করেছিলাম। এই দরজা আসলে কোন দরজা! কিসের দরজা। কোন দরজা কোন সময়ে খুলতে হয়, সেটা কি জানা থাকে সকলের। আর এই সংলাপ সর্বোচ্চ অভিঘাতে দলীয়, দেশীয় রাজনীতিকে এনে ফেলে ব্যক্তি মানুষের চিরন্তন রাজনীতিতে, সম্পর্কের রাজনীতিতে। আমি এখনও মানতে নারাজ এই নাটক আসলে রাজনৈতিক নাটক, যাকে বলে 'পলিটিক্যাল প্লে'। ইংরাজি নাটকটি পড়া পর্যন্ত সে কথা মেনে নিতে পারতাম, কিন্তু না। নাটক থেকে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ, আজীবনের বামপন্থী, এক্সাইডের শীতের রাস্তা দিয়ে যখন বাড়ি ফেরেন, তিনিও হয়ত আমার মতোই ভাবেন, সেদিন আমি যাকে বিশ্বাস করে সর্বস্ব অর্পণ করে হেঁটেছিলাম অজানার পথে, সে নিজেকে বিকিয়ে দেবে ভাবতে পারিনি। কিন্তু আসলে সব বিক্রি হয়। সেই বিক্রি হওয়ার পথে, হুগো, ঢোঁড়াই, সব্যসাচীরা শুধু হেঁটে চলেন অবিরাম, যুগে-যুগে, কালে-কালান্তরে। কোনও এক ভোরের আলোয় হয়ত তাদের শিলুয়্যেট ধরা পড়ে ইতিহাসের পাতায়।