শহুরে, বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবন, তাঁদের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে এক অনন্য ভাষায় বাংলা সাহিত্যে ধরেছিলেন যিনি, তিনি শংকর। মণিশংকর মুখার্জি। ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁওয়ে (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের যশোর জেলার বনগ্রামে) এই মহীরুহ জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তাঁর বাবা, হরিপদ মুখার্জি চলে যান কলকাতার ওপারে, হাওড়ায়। লেখকের শৈশব কাটে সেখানেই। বড় হয়ে ওঠা, শিক্ষা, সাহিত্যচর্চার শুরু, সবটা মিলিয়ে হাওড়া ওঁর জীবনের বর্ণময় অধ্যায়। তবুও জীবন খুব সরলরৈখিক ছিল না। জীবনের শুরুতে কখনও ফেরিওয়ালা, কখনও টাইপরাইটার ক্লিনার, কখনও প্রাইভেট টিউশনি, কখনও বা শিক্ষকতা অথবা জুট ব্রোকারের কনিষ্ঠ কেরানিগিরি করে দিন গুজরান করতে হয়েছে। তবে এই সংগ্রাম, ওঁর কলমে গল্প হয়ে চিনিয়েছে মধ্যবিত্তের কলকাতাকে। 

১৯৫৫ সাল। ‘কত অজানারে’ লিখলেন শংকর। প্রথম বই, জনপ্রিয়তা এনে দিল। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে, ঋত্বিক ঘটক এই উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মানের কাজ শুরু করেন। কিন্তু, অসমাপ্ত থেকে যায় সেই কাজ। শংকরের উপন্যাসকে পাথেয় করে চলচ্চিত্র নির্মান হয়েছে আরও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। লেখকের লেখা ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’-কে ঘিরে, বাংলা সিনেমার অন্যতম ক্লাসিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায় (যথাক্রমে ১৯৭১, এবং ১৯৭৬ সালে)। অপর দিকে কলকাতার এক অভিজাত হোটেলকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’ বাংলা সাহিত্যে শহুরে উপন্যাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। হোটেলের আড়ম্বরের আড়ালে মানুষের নিঃসঙ্গতা, প্রেম, প্রতারণা ও আকাঙ্ক্ষার যে মিশ্র চিত্র তিনি এঁকেছিলেন, তা পাঠকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। বইটি একাধিক ভাষায় অনূদিত হয় এবং দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় থাকে। বিপুল জনপ্রিয় এবং বেস্ট সেলার বই ‘চৌরঙ্গী’ কে পাথেয় করে ১৯৬৮ সালে, পিনাকি ভূষণ মুখার্জির চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন উত্তম কুমার। একই সঙ্গে পাঠক ও দর্শক হৃদয় জয় করে এই একটি নাম, চৌরঙ্গী। এই চলচ্চিত্রগুলি বাংলা সিনেমায় কর্পোরেট ও নাগরিক সঙ্কটকে নতুন মাত্রা দেয় এবং আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়।

শংকরের জনপ্রিয়তার আরও একটি কারণ তাঁর ভাষার সহজতা ও কাহিনির গতিময়তা। তিনি জটিল দর্শন বা অলঙ্কারের আশ্রয় না নিয়ে, সরল অথচ শক্তিশালী বর্ণনায় মানুষের অন্তর্লোক তুলে ধরতেন। মধ্যবিত্ত পাঠক তাঁর লেখায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতেন— স্বপ্নভঙ্গ, সাফল্যের তৃষ্ণা, সামাজিক উত্থানের লড়াই, সবই যেন চেনা। 

এ বাদে রয়েছে আরও অনেক লেখা। জনপ্রিয় তালিকায় অন্তর্ভূক্ত ‘ঘরের মধ্যে ঘর’, ‘সোনার সংসার’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’, ‘রূপতাপস’ ইত্যাদি। সত্তর দশকের অশান্ত কলকাতা নিয়ে তাঁর ‘স্থানীয় সংবাদ’ উপন্যাসটি। ভ্রমণকাহিনী, গল্প, উপন্যাস মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭০। বিখ্যাত সাহিত্যিক শরদিন্দু ব্যানার্জি বলেছিলেন, “তোমার এই লেখায় জননী-জন্মভূমিকেই আমি সারাক্ষণ উপলব্ধি করলাম।” লেখকের কর্মজীবনকে সম্মান জানাতে ২০১৬ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওঁকে ডি.লিট সম্মান দেওয়া হয়। তাছাড়া ২০১৯-এ, এক বছরের জন্য, ওঁকে কলকাতার শেরিফ পদে মনোনয়ন করা হয়। ২০২০-তে, ‘একা একা একাশি’ বইটির জন্য সাহিত্য একাডেমি সম্মান পান। 

পেশাগত জীবনে তিনি দীর্ঘদিন কর্পোরেট জগতের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করলেও, সাহিত্য ছিল তাঁর আত্মার জায়গা। অফিসের অভিজ্ঞতা, মানুষের চরিত্র পর্যবেক্ষণ এবং সময়ের সামাজিক পরিবর্তন— সব মিলিয়ে তিনি এক অনন্য ধারার সাহিত্য রচনা করেন। তাঁর লেখায় যেমন আছে উচ্চাকাঙ্ক্ষার দীপ্তি, তেমনি আছে নৈতিক প্রশ্নের ছায়া।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সংযত ও পরিশ্রমী। তাঁর লেখায় নিজের সংগ্রামের কাহিনি কখনও আড়াল হয়নি। জীবনের প্রাথমিক দুঃসময়ের কথা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।

মণিশংকর মুখার্জি বাংলা সাহিত্যে শহুরে উপন্যাসের এক শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। তাঁর কলমে কলকাতা শুধু একটি শহর নয়— একটি চরিত্র, একটি স্বপ্ন, কখনোবা এক নির্মম বাস্তবতা। পাঠকমনে তাঁর সৃষ্টি আজও জীবন্ত, এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

লেখক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, বাংলা সাহিত্যকে উজাড় করে দিয়ে, এই মহীরুহ বিদায় নিলেন ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ।