অংশুমান কর
১৯৮৬-র বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার ঠিক আগে ঘ্যানঘ্যান করতে শুরু করেছিলাম খেলা দেখার জন্য আমাদের একটা টিভি চাই। আমি তখন ‘খেলা’ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। প্রতিটি পাতা গিলে খাই। সত্যি বলতে কি, ‘খেলা’র মাধ্যমেই তখন বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই আমরা পেয়ে যেতাম বিশ্বকাপের নানা খবর আর উত্তেজনায় সারাক্ষণ কেঁপে চলত আমাদের হৃদয়। তখন আমাদের পাড়ায় একটি মাত্র টিভি ছিল। সেটি ছিল কাঠমিলের মালিক গুজরাট থেকে আসা প্যাটেলদের। সেখানেই আমরা খেলা দেখতে হাজির হতাম। সেসব খেলা হতো বিকেলে। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান স্পোর্টিংয়ের ম্যাচ। কিন্তু ওদের বাড়িতে কি আর বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া যেতে পারে? কারণ সব ম্যাচই তো গভীর রাতে। বিশ্বকাপ যতই এগিয়ে আসতে লাগল ততই মনে হচ্ছিল একটা টিভি আমাদের দরকার। দরকার তো বটে কিন্তু আসে কোথা থেকে? প্রতিবন্ধকতা ছিল দু’টি। প্রথম প্রতিবন্ধকতা আমার জেঠু, কড়া মাস্টারমশাই যিনি মনে করতেন টিভি দেখলে আমাদের পড়াশুনোর বারোটা বেজে যাবে। দ্বিতীয় প্রতিবন্ধকতা অর্থ। আমার বাবা তখন কেরানি। মাইনে খুবই কম। টিভি কেনা বাহুল্য বই কি! জেঠুকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সাজিয়ে রাজি করাল বাবাই। তারপর মাসিক কিস্তিতে দাম শোধ দেওয়ার চুক্তিতে কেনা হল আমাদের প্রথম টিভি, কোনার্কের, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। শুরু হল বিশ্বকাপ। আমাদের বাড়িতেই পাড়ার সকলে জড়ো হয়ে চলল খেলা দেখা। মধ্যরাতে কাপের পর কাপ চা উড়ে যেতে থাকল। একটা খেলা শেষ হওয়ার পর বেশ খানিকক্ষণ বিরতি থাকত। তারপর দ্বিতীয় খেলা। সেই বিরতিতে কাবুদা নিয়ম করে শোনাত ভূতের গল্প।
সেই টিভির পর্দাতেই দেখলাম বেঁটে ছটফটে একটা লোক মাঠে যা খুশি তাই করছে, যেন জলের ওপর আলপনা আঁকছে। এই মাঠের এক কোণে ঝিরঝিরে এক ছোট্ট নদী হয়ে বয়ে চলেছে তো ওই মাঠের অন্য কোণে কালবৈশাখী হয়ে আছড়ে পড়ছে। সেই ঝড়েরও কী অপরূপ রূপ! সত্যি বলতে কি, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে দেবতার মতো সুদর্শন প্লাতিনিকে দেখে দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল ফ্রান্সের প্রতি। কিন্তু মাঠে মানুষের ছদ্মবেশে সাক্ষাৎ সুন্দরকে দেখে হয়ে গেলাম মারাদোনার ফ্যান। আর মারাদোনা মানেই তো আর্জেন্টিনা।
’৮৬-র পর আর কাপ এল না। কিন্তু আমি তবু আর্জেন্টিনা। মনে আছে ১৯৯০-এ আধখানা প্লেয়ার ক্যানিজিয়াকে নিয়ে মারাদোনার কী সে লড়াই! তারপর ডোপ কেলেঙ্কারি। ১৯৯৪-এ দলের ক্যাপ্টেন থাকাকালীনই নির্বাসন। তবুও আমি আর্জেন্টিনা। তবুও আমি মারাদোনা। কারণ ওই শিল্প। ডোপ করে তো আর মাঠে জুঁই ফুলের সুগন্ধ ছড়িয়ে দেওয়া যায় না! আর ব্যক্তিজীবন দিয়ে যদি শিল্পকে মাপতে যাই তাহলে তো সবার আগে পিকাসোকেই ঝেড়ে ফেলতে হয়! মারাদোনা বিদায় নেওয়ার পর এলেন ওর্তেগা। এই ছোট্ট গাধা আমাদের কাপ এনে দেবে ভেবেছিলাম। কিন্তু, তা হল না। তারপর তো এলেন মেসি। এলেন দেখলেন এবং জয় করলেন। মেসি যে-দলে খেলেন, সেই দলকে ছেড়ে কি আর অন্য কোনও দলকে সমর্থন করা যায়?
তাহলে কি কেবল ব্যক্তিপুজো করতে করতেই আমি হয়ে গিয়েছি আর্জেন্টিনার সমর্থক? তা কিন্তু নয়। আমেরিকান আর ইউরোপীয় ঘরানার ফুটবলের ঠিক মাঝখানে যেন দাঁড়িয়ে থাকে আর্জেন্টিনার ফুটবল। ব্রাজিলকে এখনও মাঝে মাঝে মনে হয় বুঝি মাঠ জুড়ে নানা রঙের ফুল ফোটাতেই ব্যস্ত। গোল হল কি না তা নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। উল্টো দিকে জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ড আবার শুধু গোলই বোঝে। পাসের পর পাস জুড়ে পুরো মাঠ জোৎস্নায় ঢেকে দিতে তাদের বয়েই গিয়েছে। আমার মনে হয় একজন শিল্পীর জীবনে যেমন সৌন্দর্য থাকা দরকার, তেমনই লক্ষ্যও থাকা দরকার, বিশেষ করে যদি তিনি কোনও প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। খেলার মাঠে শক্তি চট্টোপাধ্যায় হলে চলে না, হতে হয় সুব্রত চক্রবর্তী, যিনি জানেন কবিদেরও ঘর গেরস্থালি আছে, রোজ সকালে বাজারের থলে হাতে কবিকেও মাছ কিনতে যেতে হয়। ব্রাজিল যদি হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায় তবে আর্জেন্টিনা হল সুব্রত চক্রবর্তী, যিনি যতখানি কবি ততখানিই কলেজের ফিজিক্সের অধ্যাপক। কবিতা লিখিয়ে হিসেবে আমিও সুব্রত চক্রবর্তীর দলে। আর্জেন্টিনা ছাড়া অন্য কোনও দলকে সমর্থন করি কী করে?















