ভালবেসে স্ত্রীকে নিজের শরীরের অন্যতম মূল্যবান অঙ্গ দান করেছিলেন স্বামী। ভেবেছিলেন, এই ত্যাগের পর তাঁদের দাম্পত্য আজীবন অটুট থাকবে। কিন্তু কে জানত, কয়েক বছর পরেই সেই স্ত্রীই হাতে ধরিয়ে দেবেন বিচ্ছেদের নোটিশ! চরম আঘাতে দিশেহারা হয়ে স্বামী সোজা চলে গেলেন আদালতে। বিচারকের এজলাসে দাঁড়িয়ে বুক কাঁপানো গলায় দাবি তুললেন— “হয় আমার দান করা কিডনি শরীর কেটে ফেরত দাও, আর নয়তো ক্ষতিপূরণ বাবদ আমায় দাও নগদ ১.৫ মিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা)!”
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব আইন আদালতের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত চর্চিত ও নজিরবিহীন এই ঘটনাটি আমেরিকার। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টের পর এই অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্য ঘটনাটি নতুন করে ভাইরাল হয়েছে এবং নেটিজেনদের রাতের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে।
এই রোমহর্ষক ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯০ সালে, আমেরিকার নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে। পেশায় প্রথিতযশা শল্য চিকিৎসক ডঃ রিচার্ড বতিস্তা বিয়ে করেছিলেন ডনিল বতিস্তাকে। সংসার ভালই চলছিল। কিন্তু বিয়ের কিছু বছরের মাথায় ডনিলের দুটি কিডনিই মারাত্মকভাবে বিকল হয়ে পড়ে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দিন গুনছিলেন স্ত্রী। ডাক্তার স্বামী রিচার্ড স্ত্রীকে বাঁচাতে এক মুহূর্তও ভাবেননি। ২০০১ সালে নিজের শরীর থেকে একটি কিডনি কেটে স্ত্রীর শরীরে প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অপারেশন সফল হয় এবং স্বামীর দেওয়া কিডনিতেই নতুন জীবন ফিরে পান ডনিল।
রিচার্ড ভেবেছিলেন, নিজের জীবন বাজি রেখে করা এই ত্যাগ তাঁদের সম্পর্ককে অমর করে রাখবে। ভালবাসাকে রাখবে অটুট। কিন্তু সম্পর্কের সমীকরণ বদলাতে সময় লাগেনি। ২০০৫ সালে আচমকাই রিচার্ডের পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিয়ে ডনিল আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা দায়ের করেন। বিচ্ছেদের নোটিশ পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ডঃ রিচার্ড। লং আইল্যান্ডে নিজের আইনজীবীর চেম্বারে সাংবাদিকদের ডেকে ডনিলের বিরুদ্ধে চরম ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “আমি ওকে শুধু নিজের মনই দিইনি, ওঁর জীবন বাঁচাতে আমার নিজের শরীরের একটা অংশ পর্যন্ত কেটে দিয়েছি। আর বদলে আমি কী পেলাম? চরম প্রতারণা!”
রিচার্ডের হয়ে আদালতে সওয়াল করতে গিয়ে প্রখ্যাত আইনজীবী ডমিনিক বারবারা বিচারকদের স্তম্ভিত করে দেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর মক্কেল রিচার্ড নিজের দান করা কিডনি ফেরত চান। আর তা যদি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মে অসম্ভব হয়, তবে ওই কিডনির সমমূল্য হিসেবে ডনিলকে দিতে হবে ১৫ লক্ষ মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা!
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনজ্ঞদের মধ্যে শোরগোল পড়ে যায়। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার যদি কোনও ব্যক্তি স্বেচ্ছায় এবং সুস্থ মস্তিষ্কে নিজের কোনও অঙ্গ অন্য কাউকে দান (Organ Donation) করে ফেলেন, তবে তা আর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা যৌথ দাম্পত্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না। আইন অনুযায়ী, অঙ্গদান একটি স্থায়ী ও অপরিবর্তনশীল সিদ্ধান্ত। তাই আদালত কোনওভাবেই শরীর কেটে কিডনি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে না।
স্বভাবতই, রিচার্ডের এই দাবি আদতে খারিজ হয়ে যায় এবং তা মূলত স্ত্রীর ওপর মানসিক চাপ ও প্রতিবাদের প্রতীকী ভাষা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অন্যদিকে, ডনিলের আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন যে সত্যটি রিচার্ড যেভাবে তুলে ধরছেন, আদতে নাকি তা নয়। যদিও ডনিলের পক্ষ থেকে আর কোনও স্পষ্ট বিবৃতি প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনাটি নতুন করে ভাইরাল হতেই জল্পনা শুরু হয়েছে যে, অন্য এক পুরুষের প্রেমে পড়েই নাকি ডনিল তাঁর জীবনদাতা স্বামীকে বিচ্ছেদ দিয়েছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক স্তরের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে কোনও ‘তৃতীয় ব্যক্তি’র প্রবেশ ঘটেছিল কি না, তা আদালতের নথিপত্রে বা প্রকাশ্যে প্রমাণিত হয়নি।
তবুও, এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান ও সম্পর্কের এই চরম টানাপোড়েন আজও মানুষকে ভাবায়— বিশ্বাস আর ভলোবাসার কি সত্যিই কোনও শেষ স্টেশন আছে?
















