বাইবেলের সেই বিখ্যাত ‘জোনাহ অ্যান্ড দ্য হোয়েল’ -এর গল্প মনে আছে? যেখানে এক ব্যক্তিকে আস্ত গিলে ফেলেছিল এক বিশাল তিমি মাছ, আর পরে তাকে অক্ষত অবস্থায় উগড়ে দিয়েছিল সৈকতে। রূপকথার বা ধর্মীয় পুরাণের সেই গল্পই হুবহু বাস্তবে ঘটেছিল আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে। ২০২১ সালের জুন মাসের সেই হাড়হিম করা ঘটনা আজও ইন্টারনেটের দুনিয়ায় অন্যতম সেরা এবং অবিশ্বাস্য সারভাইভাল স্টোরি হিসেবে চর্চিত হয়।

আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের অভিজ্ঞ কমার্শিয়াল ডাইভার মাইকেল প্যাকার্ড যখন কেপ কডের ঠাণ্ডা জলে গলদা চিংড়ি ধরার জন্য নেমেছিলেন, তখন তিনি ভাবতেও পারেননি যে প্রকৃতির এক চরম বিস্ময়ের মুখোমুখি হতে চলেছেন তিনি।

প্রোভিন্সটাউনের কাছে সমুদ্রের প্রায় ৪৫ ফুট গভীরে সাঁতার কাটছিলেন মাইকেল। আচমকাই পেছন থেকে এক পাহাড়প্রমাণ শক্তি এসে ওঁকে ধাক্কা মারে। পরের মুহূর্তেই চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়! মাইকেলের কথায়— “হঠাৎ একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম আর এক লহমায় চারপাশে সব অন্ধকার হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম কোনও বিশাল হাঙর বুঝি আমায় গিলে ফেলেছে!”

কিন্তু না, ওটা কোনও হাঙর ছিল না। মাইকেল কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারেন, ওঁর চারপাশের দেওয়ালে তীব্র সংকোচন ও চাপ তৈরি হচ্ছে, অথচ ওঁর স্কুবা ডাইভিংয়ের অক্সিজেন মাস্কটি তখনও ওঁর মুখে রয়েছে এবং তিনি শ্বাস নিতে পারছেন! আসলে তিনি তখন ঢুকে গিয়েছিলেন একটি বিশাল হাম্পব্যাক তিমির (Humpback Whale) মুখের ভেতর!

মাইকেলের অনুমান অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড ওই নরককুণ্ডে বন্দি ছিলেন। এর পরই তিমিটি আচমকা সমুদ্রের উপরিভাগে চলে আসে এবং মাথা ঝাঁকিয়ে তীব্র গতিতে মাইকেলকে মুখ থেকে মহাসাগরের জলে উগড়ে ফেলে দেয় থুতু ছেটানোর মতো।মাইকেলের ক্রু-মেম্বাররা জল থেকে ওঁকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন, শরীরের কিছু সফট টিস্যুর চোট এবং কালশিটে ছাড়া ওঁর একটি হাড়ও ভাঙেনি! সেদিন বিকেলেই ওঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

 

 

স্বভাবতই এই খবর ছড়াতেই বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে যায়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, একটা আস্ত মানুষকে কি তিমি গিলে ফেলতে পারে?সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা অবশ্য এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। 

সরু গলা: হাম্পব্যাক তিমির মুখ যত বড়ই হোক না কেন, ওঁরদের গলার ফুটো বা খাদ্যনালী অত্যন্ত সরু হয়। ফলে একটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে গিলে ফেলা ওঁরদের পক্ষে শারীরিকভাবে অসম্ভব।

ভুলবশত মুখগহ্বরে প্রবেশ: তিমিটি যখন মুখ হাঁ করে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট মাছ গিলছিল, তখনই দুর্ঘটনাবশত মাইকেল ওঁর মুখের ভেতর ঢুকে পড়েন। তিমিরা সাধারণত মানুষ খায় না, তাই মুখের ভেতর ভিন্ন কোনও বস্তু টের পেয়েই সে মাইকেলকে বাইরে উগড়ে দেয়।

পৌরাণিক কাহিনির মতো শোনালেও এই ঘটনার পেছনে প্রত্যক্ষদর্শী, উদ্ধারকারী দল এবং হাসপাতালের নথিপত্র থাকায় একে কেউ হেসেই উড়িয়ে দিতে পারেননি। মাইকেল প্যাকার্ড নিজেও পরবর্তীকালে স্বীকার করেছিলেন, প্রকৃতির বুক থেকে ওঁর এই ফিরে আসাটা ওঁর নিজের কাছেই আজও একটি অলৌকিক স্বপ্ন বলেই মনে হয়!