যখন আমরা তরুণ, তখন বয়স বাড়ার অনিবার্য সত্যিটা যেন অনেক দূরের কোনও দিগন্তে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই সময়ে মনে হয়, এই দৌড়ঝাঁপ, শরীরের চনমনে ভাব -সব বুঝি ঠিক এরকমভাবেই চিরকাল থাকবে। কিন্তু দীর্ঘ ৪৭ বছরের একটি গবেষণা বলছে, বাস্তবটা মোটেই তেমন নয়। বেশিরভাগ মানুষ মধ্য বয়সে পৌঁছনোর আগেই শরীরের সেরা সময় পেরিয়ে ফেলেন। শরীর যখন ধীরে ধীরে ছোটখাটো আঘাত সামলাতে পারে না, ক্লান্তি জমতে থাকে, এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ যে খুব দূরে নয়, সেটাই জানাচ্ছে সুইডিশ রিসার্চ কাউন্সিলের অর্থপুষ্ট এই গবেষণা।
গবেষকরা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সমান সংখ্যক নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ৪২৭ জন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বেশিরভাগ মানুষের শারীরিক ক্ষমতা সর্বোচ্চ থাকে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত। তার পর থেকেই শুরু হয় ধীরে ধীরে পতন।
সুইডেনের গবেষকদের দলটি আরও জানাচ্ছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শারীরিক অবক্ষয় ক্রমশ দ্রুততর হয়। মূল কারণ হল, স্কেলেটাল মাসল বা পেশির ভর ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।
তবে এই খবর শুনে এখনই পুরোপুরি হতাশ হবেন না। গবেষণায় এমন একটি অভ্যাসের কথাও উঠে এসেছে, যা এই প্রক্রিয়াকে অনেকটাই ধীর করতে পারে। যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ৩৫ বছর বয়সেই শারীরিক সক্ষমতার শিখর আসে, এই ব্যাপারটা বদলায় না। তবে হ্যাঁ, ভাল ফিটনেস থাকলে শারীরিক সক্ষমতার কমার গতি অনেকটাই কমে যায়।অর্থাৎ নিয়মিত ব্যায়াম করা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু যতই জিমে সময় কাটান বা দৌড়ান না কেন, কিশোর বয়স বা কুড়ির কোঠার সেই ফিটনেস আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
এর আগেও শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়াবিদদের উপর হওয়া গবেষণায় একই ধরনের তথ্য মিলেছে বলে জানাচ্ছে সায়েন্স অ্যালার্ট। অধিকাংশ খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রেই ৩০ বছর বয়সের পর থেকে পারফরম্যান্স কমতে শুরু করে। এর থেকে গবেষকদের ধারণা, শরীরে পেশি ক্ষয়ের প্রক্রিয়া হয়তো শারীরিক পারফরম্যান্স কমার বহু বছর আগেই শুরু হয়ে যায়, এবং এই প্রক্রিয়ায় ব্যায়ামের প্রভাব সীমিত হয়।
জার্নাল অফ ক্যাক্সেসিয়া, সারসপেনিয়া এবং মাসল -এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি মূলত সাধারণ মানুষের উপর ভিত্তি করে, কোনও পেশাদার অ্যাথলিট নয়। তবু আশ্চর্যের বিষয়, এখানেও পেশি ক্ষয়ের ধরণ প্রায় একই রকম দেখা গিয়েছে। এ পর্যন্ত এই বিষয়ে হওয়া বেশিরভাগ গবেষণাই ছিল নির্দিষ্ট সময়ের ছবি যে একটি বয়সে মানুষ কেমন আছে, তা দেখা। কিন্তু এই গবেষণাটি ছিল লংগিটিউডিনাল, অর্থাৎ একই মানুষদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসরণ করা হয়েছে।
গবেষণা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে, যখন অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৬। এরপর তাঁদের শারীরিক শক্তি ও ফিটনেস পরীক্ষা করা হয় ১৬, ২৭, ৩৪, ৫২ ও ৬৩ বছর বয়সে।
ফলাফল বলছে,
পুরুষদের পেশির ক্ষমতা সর্বোচ্চ হয় ২৭ বছরে,
নারীদের ক্ষেত্রে তা আরও আগে, ১৯ বছরে।
এরপর প্রতি বছর পেশির ভর ০.২ থেকে ০.৫ শতাংশ করে কমতে থাকে।
৬৩ বছরে পৌঁছনোর সময় দেখা যায়, শারীরিক সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছে।
তবে যাঁরা ১৬ বছর বয়স থেকেই নিয়মিত ভারী শরীরচর্চা করেছেন, তাঁদের সব ক্ষেত্রেই ফলাফল তুলনামূলক ভাল ছিল, যদিও তাঁদের ক্ষেত্রেও ৩৫-এর পর পতন শুরু হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক বলছেন, “ব্যায়াম শুরু করার জন্য কোনও বয়স-ই দেরি হওয়ার কারণ হতে পারে না। আমাদের গবেষণা দেখাচ্ছে, শারীরিক পরিশ্রম কর্মক্ষমতার পতনকে ধীর করতে পারে, যদিও পুরোপুরি থামাতে পারে না।” তিনি আরও জানান,“এখন আমরা খুঁজে দেখব কেন সবাই ৩৫ বছর বয়সেই শারীরিক শিখরে পৌঁছয় এবং কেন শরীরচর্চা এই পেশির সক্ষমতার পতনকে পুরোপুরি আটকাতে পারে না।”
