রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে সূর্য। সকাল হতে না হতেই ঘেমেনেয়ে একশা অবস্থা। বেলা গড়ালে ত্রাহি ত্রাহি রব। দিন কিংবা রাত, তুমুল গরমের হাত থেকে স্বস্তি নেই এতটুকুও। এমনকী অঝোর বৃষ্টি হলেও থামতে না থামতেই আবার যে-কে-সেই। অতএব পাখা, এসি, বাড়ি কিংবা অন্দরে সেঁধিয়ে থাকাতেই আস্থা রাখছে আমজনতা। বাইরে বেরোনোর কাজ যথাসম্ভব তোলা থাকছে বিকেল-সন্ধের জন্য।    

কিন্তু ভাবুন তো, সবার কি আর সে সৌভাগ্য হয়? পেশার খাতিরে যাঁদের সারাক্ষণ বাইরে ঘোরা ছাড়া গতি নেই, এই নাকাল করা গরমেও তাঁদের দিন কাটছে রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে। শরীর থেকে এনার্জির শেষ ভগ্নাংশটুকুও নিংড়ে দিয়ে। কিন্তু এমন আবহাওয়ায় দিনের বেলাটা রোজ বাইরে কাটাতে হলে ডিহাইড্রেশন, হিটস্ট্রোক, পেটের সমস্যা এড়িয়ে সুস্থ থাকার ব্যবস্থাটুকুও যে করতে হবে নিজেকেই। তাই এই বেলা জেনে নিন কী কী সাবধানতা নেওয়া ভীষণ জরুরি। 

যা পরবেন

মনের মতো স্টাইল, যে কোনও ভারী ফ্যাব্রিক এসময় বাদ। দিনের বেলাটা বাইরে কাটাতে হলে বেছে নিন একেবারে হাল্কা, মোলায়েম এবং ঢিলেঢালা সুতির পোশাক। চড়া রোদে যতটা সম্ভব ঢাকা পোশাক পরাই ভাল। মাথায় থাকুক টুপি কিংবা স্কার্ফের আড়াল। এবং চোখে রোদচশমা। দরকারে মুখের ত্বক পুড়ে যাওয়া বা চুলের ক্ষতি আটকাতে ওড়না বা স্কার্ফ দিয়ে ভাল করে মাথা ও মুখ জড়িয়ে নিতে পারেন। হাতের খোলা অংশে পরতে পারেন সুতির গ্লাভস। 
    
যা মাখবেন

বেরোনোর আগে ত্বকের ধরন অনুযায়ী অবশ্যই মুখে, হাতে এবং শরীরের অন্যান্য খোলা অংশে মেখে নিন এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার সানস্ক্রিন। প্রয়োজনে একাধিক বারও তা ব্যবহার করতে পারেন। বেশি কিংবা ভারী মেকআপ এ সময়ে নৈব নৈব চ। যেটুকু না করলেই নয়, দরকারে সেটুকুই মেকআপ লাগান। ত্বক যাতে আর্দ্র থাকে, ব্যবহার করুন শুধুমাত্র সেই জাতীয় প্রসাধনী। চুলের ক্ষেত্রে নিয়মিত হাল্কা শ্যাম্পু দিয়ে মাথা পরিষ্কার রাখুন। এ সময়টায় স্ক্যাল্পে ঘাম জমে থাকে, যা চুলের পক্ষে ক্ষতিকর। রোদে চুলের রুক্ষ হয়ে পড়া আটকাতে চুলের ধরন অনুযায়ী সঠিক তেল বা কন্ডিশনার বেছে নিন। ঢাকা জুতো পরার অভ্যাস থাকলে অবশ্যই বাড়ি ফিরে পা সঠিক ভাবে পরিষ্কার করুন এবং যত্ন নিন। খোলামেলা জুতো পরলে পায়েও সানস্ক্রিন লাগাতে ভুলবেন না।

যা খাবেন

ডায়েটিশিয়ান পম্পা রায় বলছেন, রোদে বাইরে ঘুরলে অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে লবণ অর্থাৎ সোডিয়াম, ক্লোরাইড বেরিয়ে যায়। তাই লেবুর জলে একটু নুন, পুদিনা পাতা আর শসা কুচি মেশানো শরবত তিন-চার বার ২০০-২৫০ মিলিলিটার করে পান করতে পারেন। ছাতুর শরবত, দইয়ের ঘোল, লস্যি, ডাবের জলেও আরাম পাবেন। এ ছাড়া, বাইরে বেরোলে এক লিটার জলে ২১ গ্রাম প্যাকেটের ওআরএস মিশিয়ে অবশ্যই সঙ্গে রাখুন। তবে একবারে ঢকঢক করে নয়, বারে বারে একটু করে খেতে থাকবেন।

এই সময়ে সহজপাচ্য, হাল্কা খাবার খাওয়া খুবই জরুরি। খুব কষিয়ে রান্না এড়িয়ে চলুন। তেল-মশলা সবই থাকুক রান্নায়, তবে একেবারে অল্প পরিমাণে। গোলমরিচ, হলুদ, জিরে বা ধনে গুঁড়ো ব্যবহার করতে পারেন। বাইরে ঘোরাঘুরির সময়ে ডিহাইড্রেশন এড়াতে কিংবা বাড়িতে দিনের খাদ্যতালিকায় অবশ্যই থাক এমন ফল ও সব্জি, যাতে জলের ভাগ বেশি। যেমন, তরমুজ, ফুটি, মোসাম্বির মতো ফল বা সব্জির ক্ষেত্রে শশা, লাউ, ঝিঙে, চিচিঙ্গে, পটল। কড়া রোদে পরিশ্রমের রুটিনে শরীর যাতে দুর্বল হয়ে না পড়ে, তার জন্য প্রোটিনের জোগান ঠিক রাখতে রোজের খাদ্যতালিকায় রাখুন ১০০-১৫০ গ্রাম মাছের পাতলা ঝোল এবং ব্রেকফাস্টে একটা গোটা ডিম সেদ্ধ। 

সারাদিন বাইরে কাটলে ঘন ঘন চা কফি খাওয়া একেবারেই চলবে না কিন্তু। কারণ এতে থাকা ক্যাফেইন শরীর থেকে আর্দ্রতা টেনে নেয়। ফলে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়ে। পেটের সমস্যা থেকে দূরে থাকতে এড়িয়ে চলুন মুরগির মাংস, বাইরের কাটা ফল বা শরবত, বাজারচলতি নরম পানীয় এবং সোডা।   

যা করবেন

টুপি, স্কার্ফ, সানগ্লাস ব্যবহার করলেও বাইরে বেরোলে অবশ্যই সঙ্গে রাখুন ছাতা। কড়া রোদে তা বাড়তি সুরক্ষা দেবে। অবশ্যই সঙ্গে রাখুন জলের বোতল, রুমাল, সানস্ক্রিন লোশন, ওআরএস, নুন-চিনির জল বা গ্লুকোজ জাতীয় জিনিস এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। সারাদিনে বারে বারে জল খান। ক্লান্ত লাগলে তৎক্ষণাৎ অবশ্যই ছায়ায় গিয়ে জিরিয়ে নিন। এতটুকু অসুস্থ বোধ করলে বিশ্রাম নিন। প্রয়োজন বুঝলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের সাহায্য নিন। দেরি করবেন না। চড়া রোদে রোজ বাইরে ঘুরলে হিট স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি থাকে সকলেরই। তা এড়াতে যথাসম্ভব সাবধানে থাকুন। রোদ থেকে ফিরেই সঙ্গে সঙ্গে এসিতে ঢুকে পড়বেন না বা ঠান্ডা জল-শরবত ইত্যাদি খাবেন না। একটু বিশ্রাম নিয়ে তবেই। রোদ থেকে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা জলে স্নানও করবেন না। খানিক জিরিয়ে নিয়ে তবেই স্নানের পাট শুরু করুন। রাতে স্নান করলে একটু ঈষদুষ্ণ গরম জলে করতে পারেন। এতে ক্লান্তিও কাটে, ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিও কমে।

প্রখর রোদে বাইরে ঘোরার কাজে তাই সাবধান। বাড়তি সতর্ক হলে সুস্থ থাকবেন আপনিই।