মাল্টিপল অর্গান ফেলিওর বা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ একসঙ্গে বিকল হয়ে যাওয়া শুধু গুরুতর অসুস্থ বা বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে—এমন ধারণা ভুল। চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষও বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এই প্রাণঘাতী অবস্থার মুখোমুখি হতে পারেন। 

মাল্টিপল অর্গান ফেলিওর (Multiple Organ Failure বা Multiple Organ Dysfunction Syndrome - MODS) হল এমন একটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যখন শরীরের দুটি বা তার বেশি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ একসঙ্গে  স্বাভাবিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এটি একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি এবং দ্রুত চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতী হতে পারে। যে অঙ্গগুলি সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, সেগুলি হল, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার মতো গুরুতর আঘাত, শরীরের বড় অংশ পুড়ে যাওয়া, বিষক্রিয়া বা বড় ধরনের সংক্রমণ শরীরে অতিরিক্ত প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া (ইনফ্ল্যামেটরি রেসপন্স) তৈরি করতে পারে। প্রথমে এই প্রতিক্রিয়া শরীরকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস, কিডনি, লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। 

চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে মাল্টিপল অর্গান ফেলিওরের অন্যতম বড় কারণ সেপসিস। শরীরের কোনও সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়লে সেপসিস হতে পারে। প্রথম দিকে জ্বর, কাঁপুনি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা দুর্বলতার মতো সাধারণ উপসর্গ দেখা দিলেও, সময়মতো চিকিৎসা না হলে সংক্রমণ দ্রুত একাধিক অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে।

এ ছাড়া বড় অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকলে পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার (ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস) ঝুঁকি বাড়ে। সেই জমাট রক্ত ফুসফুসে পৌঁছে গেলে পালমোনারি এমবোলিজম হতে পারে। এর ফলে শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ হঠাৎ কমে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, স্টেরয়েড, ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কিছু ভেষজ ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ফলে গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং মাল্টিপল অর্গান ফেলিওরের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। 

এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। সিটি স্ক্যান, রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য জরুরি পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা শুরু করা হয়। প্রয়োজনে আইসিইউতে রেখে অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর, রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের সাহায্য নেওয়া হতে পারে। 

চিকিৎসকদের পরামর্শ, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, তীব্র জ্বর, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, রক্তচাপ কমে যাওয়া বা অস্ত্রোপচারের পর আচমকা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা কমানো এবং রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।