দিল্লির জামা মসজিদের কাছে করিম’সের টেবিলে বসে সুস্বাদু মাংস মুখে তুলেও কোথায় যেন একটা বড় অভাব খচখচ করছিল—বিরিয়ানিতে আলু নেই! হায়দরাবাদি হোক বা দিল্লির ঝাল মশলাদার বিরিয়ানি, ভিনরাজ্যে গিয়ে পাত পেড়ে বসলেই কলকাতার মানুষের এই আক্ষেপ নতুন কিছু নয়।
2
9
কলকাতার রসনাতৃপ্তির ইতিহাসে বিরিয়ানি শুধু একটা খাবার নয়, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা তুলতুলে, সুগন্ধি সোনালি আলুটা যেন গোটা শহরের এক তীব্র আবেগ।
3
9
অন্য প্রদেশের মানুষ যখন তাচ্ছিল্য করে এই আলুকে মাংসের সস্তা বিকল্প বা পেট ভরানোর কৌশল বলে উড়িয়ে দেন, তখন যেকোনও খাঁটি কলকাতার মানুষের মনে আঘাত লাগাটাই স্বাভাবিক। কারণ এই শহরের কাছে বিরিয়ানির আলু কোনও আলগা অনুষঙ্গ নয়, বরং থালার কেন্দ্রবিন্দু।
4
9
তবে বিরিয়ানিতে এই আলুর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বহুল প্রচলিত ইতিহাসটি হয়তো পুরোপুরি সত্যি নয়। প্রচলিত গল্প বলে, ১৮৫৬ সালে লখনউয়ের মসনদ হারিয়ে আওয়াধের শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ যখন মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত হন, তখন তাঁর রাজকোষে চরম টান পড়েছিল; তাই মাংসের পরিমাণ কমাতে বাবুর্চিরা নাকি সস্তায় পেট ভরাতে আলুর ব্যবহার শুরু করেছিলেন।
5
9
অথচ খাদ্য ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতবর্ষে আলু কিন্তু মোটেও কোনও সস্তা খাবার ছিল না। ইউরোপীয় বণিকদের হাত ধরে আসা এই সবজিটি তখন ছিল রাজকীয় হেঁশেলের এক নতুন, বিলাসী ও চমকপ্রদ আবিষ্কার। ফলে অর্থকষ্টের দায়ে নয়, বরং রাজকীয় আওয়াধি ‘দম পুখত’ রন্ধনশৈলীতে এক অভিনব স্বাদ ও নতুনত্ব আনতেই নবাবের শৌখিন বাবুর্চিরা হাঁড়িতে আলু দিয়েছিলেন।
6
9
মাংসের সুস্বাদু যখনি, ঘি, জাফরান আর আতরের নির্যাস ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে মাংসের চেয়েও অনেক বেশি স্বাদ ধারণ করার জাদুকরী ক্ষমতা আলুর মধ্যেই ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেটিয়াবুরুজের সেই আওয়াধি ঐতিহ্যের নবজন্ম ঘটেছে কলকাতার নিজস্ব ঘরানায়। রয়্যাল, সিরাজ, আমীনিয়া, জিশান কিংবা আর্সালানের হাত ধরে কলকাতার অলিতে-গলিতে আজ ছড়িয়ে পড়েছে এক নিজস্ব রসনার মানচিত্র।
7
9
দুর্গাপূজার মধ্যরাতে রেস্তোরাঁর বাইরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার লাইন, ইদে স্কুটারের হাতলে দুলতে থাকা সুগন্ধি বিরিয়ানির প্যাকেট, কিংবা বড়দিনের রাতে পার্ক স্ট্রিটের আলো মেখে শেষপাতে বিরিয়ানির অর্ডার—উৎসবের মরসুমে বিরিয়ানি যেন শহরের নাড়ির স্পন্দন হয়ে ওঠে।
8
9
আর প্রতিটা বাঙালি পরিবারেই নিঃশব্দে এমন একজন সদস্য থাকেন, যিনি সবার অগোচরে বিরিয়ানির ওই সোনালি আলুটার দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে অপেক্ষা করেন, যাতে থালায় কেউ সেটা ফেলে রাখলে চট করে নিজের পাতে টেনে নেওয়া যায়।
9
9
শহর ছেড়ে দূরে গেলে এই আলুর অভাবই এক অদ্ভুত স্মৃতিকাতরতা তৈরি করে; মাংস আর চাল হয়তো বিরিয়ানিকে পরিচিতি দেয়, কিন্তু সেই একখণ্ড নরম সোনালি আলুই মেটিয়াবুরুজের এই ইতিহাসকে একান্তভাবে আমাদের নিজস্ব করে তুলেছে।