বাঙালির রান্নাঘরে তেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাছ ভাজা, লুচি, পরোটা, বেগুনি, চপ, কাটলেট কিংবা নানা ধরনের ঝাল-মশলাদার রান্না তেল ছাড়া যেন ভাবাই যায় না। কিন্তু স্বাদের জন্য খাবারে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করার অভ্যাস ধীরে ধীরে শরীরের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেন চিকিৎসকরা।


বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য কিছু পরিমাণ ফ্যাটের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই পরিমাণের চেয়ে বেশি তেল খাওয়া শুরু করলে সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত তেল শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি বাড়ায়, যার ফলে ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আর অতিরিক্ত ওজন থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের মতো নানা অসুখের ঝুঁকি বাড়ে।


সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হৃদযন্ত্র। অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল-এর মাত্রা বাড়তে পারে। এই কোলেস্টেরল ধমনীর ভিতরে জমতে শুরু করে। ফলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের আশঙ্কা বেড়ে যায়।


শুধু হৃদযন্ত্র নয়, লিভারের উপরও এর খারাপ প্রভাব পড়ে। বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। অতিরিক্ত তেল, জাঙ্ক ফুড এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খেলে লিভারে চর্বি জমতে থাকে।


প্রথমদিকে তেমন কোনও লক্ষণ না থাকলেও ধীরে ধীরে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে লিভারে প্রদাহও দেখা দিতে পারে।


আরও একটি বিপজ্জনক অভ্যাস হল একই তেল বারবার ব্যবহার করা। অনেক বাড়িতে বা দোকানে ভাজার পরে বেঁচে যাওয়া তেল আবার ব্যবহার করা হয়। বারবার গরম করলে তেলের গঠন বদলে যায় এবং কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। এগুলি শরীরে প্রবেশ করে কোষের ক্ষতি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।


তবে এর মানে এই নয় যে তেল পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, পরিমিত পরিমাণে ভাল মানের তেল ব্যবহার করা উচিত। সর্ষের তেল, চিনাবাদামের তেল বা অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেল সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি ভাজাভুজির বদলে সেদ্ধ, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা শ্রেয়।


খাদ্যতালিকায় বেশি করে শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখলে শরীর সুস্থ থাকে। নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চাও অতিরিক্ত চর্বি জমতে বাধা দেয়।


মনে রাখতে হবে, রোগ একদিনে হয় না। প্রতিদিনের খাবারে অল্প অল্প করে বাড়তি তেলই ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই সুস্থ জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।