আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভাড়া নেওয়ার জন্যই কী একটি বিলাসবহুল জেট এবং একটি হেলিকপ্টার কেনায় অর্থের জোগান দিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন দলটির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে ইডি-র অর্থ পাচার সংক্রান্ত তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন। দলের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়ে, ইডি তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে। এই তিন অ্যাকাউন্টে ৪৪০ কোটি টাকা জমা ছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থার এই পদক্ষেপকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে দাবি করছে তৃণমূল। 

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই প্রথম ইডি কোনও রাজনৈতিক দলের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এককভাবে তদন্ত করছে। এর আগে 'আপ' -এর অ্যাকাউন্ট নিয়েও তদন্ত হয়েছিল, তবে তা ছিল দিল্লির আবগারি নীতি সংক্রান্ত মামলার তদন্তের অংশ। ইডি-র তদন্ত তৃণমূলের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিল। জোড়া-ফুলের নেতারা ইতিমধ্যেই সই জালিয়াতি থেকে শুরু করে জমি দখলের মতো একাধিক মামলার মুখোমুখি।

এভিয়েশন সংস্থায় ইডি-র তল্লাশি
বর্তমান মামলাটির সূত্রপাত হয়েছে কলকাতার একটি এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট ও লিজিং সংস্থা 'কেয়ারওয়েল এভিয়েশন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড'-এ ইডি-র তল্লাশি অভিযানের মাধ্যমে। কৌতূহলজনক বিষয় হল, সংস্থাটি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নথিভুক্ত হয়েছিল, তার কয়েক মাস আগেই তৃণমূল তৃতীয়বারের মতো বাংলার ক্ষমতায় এসেছিল।

ইডি তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে কেয়ারওয়েল এভিয়েশনের অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়েছিল। এরপর সংস্থাটি ৮২.৯৬ কোটি টাকা অন্য একটি সদ্য গঠিত প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেয়।

ইডি-র দাবি অনুযায়ী, তৃণমূলের কাছ থেকে পাওয়া এই অর্থ ব্যবহার করে কেয়ারওয়েল একটি বিলাসবহুল বিজনেস জেট—'এমব্রায়ার ৬০০' এবং একটি 'অগাস্টা ১০৯ এসপি' হেলিকপ্টার কিনেছিল। এই দু'টি বিমানের দাম ছিল প্রায় ১১২ কোটি টাকা।

'এমব্রায়ার লিগ্যাসি ৬০০' হল ব্রাজিলীয় সংস্থা এমব্রায়ারের তৈরি একটি মাঝারি আকারের বিজনেস জেট। এর অভ্যন্তরীণ সজ্জা অত্যন্ত বিলাসবহুল এবং এতে এমন আসন রয়েছে যা ফ্ল্যাটবেড বা শোয়ার বিছানায় পরিণত করা যায়। অন্যদিকে, 'অগাস্টা ১০৯ এসপি' হল ইতালীয় সংস্থা লিওনার্দো (পূর্বনাম অগাস্টা-ওয়েস্টল্যান্ড)-র তৈরি একটি উচ্চ-গতির, টুইন-ইঞ্জিন বিশিষ্ট ভিআইপি হেলিকপ্টার। 

তাছাড়া, ইডি জানতে পেরেছে যে, ২০২৩ সালে অগাস্টাওয়েস্টল্যান্ড হেলিকপ্টারটি কেনার জন্য কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের একটি কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনাধীন অঞ্চল- কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ বিশ্বজুড়ে 'অফশোর কোম্পানি'র কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

ইডি-র বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, "এও জানা গিয়েছে যে, ওই হেলিকপ্টারটি কেনার জন্য ২০২৩ সালে কেম্যান দ্বীপপুঞ্জেরহ একটি সংস্থার কাছ থেকে ১৭ লক্ষ মার্কিন ডলার জামানতবিহীন ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল।"

নিজস্ব অর্থে কেনা বিমান কী তৃণমূল ভাড়া নিয়েছিল? 
বিষয়টি কৌতূহলের। ইডি-র নজর এদিকেই। আর্থিক তদন্তকারী সংস্থাটি দেখেছে যে, হেলিকপ্টার এবং এমব্রায়ার জেট- উভয়ই ভাড়া হিসেবে তৃণমূলকে দেওয়া হয়েছিল। অথচ, 'কেয়ারওয়েল' তৃণমূল থেকে পাওয়া অর্থ দিয়েই বিমানগুলো কিনেছিল।

সহজ কথায়, বিষয়টি অনেকটা এমন- কেউ নিজের টাকায় একটি নতুন গাড়ি কিনলেন এবং তারপর সেই গাড়িটি ব্যবহারের জন্য নিজেই ভাড়া দিয়ে গেলেন। 

কেয়ারওয়েল এভিয়েশন ভিভিআইপি-দের চার্টার পরিষেবা দিত। যার মধ্যে ছিলেন তৃণমূলের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও- যেমন মমতা ব্যানার্জির ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জি।

ইডি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, "এমব্রায়ার ৬০০ বিমান এবং অগাস্টা হেলিকপ্টারটি দলের তহবিল থেকে কেনা হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে তৃণমূলকেই ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। এরপর বিমান ব্যবহারের অজুহাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছিল।"

প্রতিহিংসার অভিযোগ তৃণমূলের
ইডি এখন এই পদক্ষেপের পেছনের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। সংস্থার সন্দেহ, লেনদেনের আসল উদ্দেশ্য আড়াল করার জন্যই হয়তো এমনটা করা হয়েছিল। দলের তহবিল তছরুপের জন্যও এই লেনদেনগুলো ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

বিধাননগর পুলিশের দায়ের করা একটি এফআইআর-এর ভিত্তিতে এই তদন্ত চলছে। তৃণমূলের 'বিদ্রোহী' বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসের অভিযোগের ওপর ভিত্তি করেই এই মামলা। উল্লেখ্য, মে মাসে বিশ্বনাথ দাস ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন।

তৃণমূল এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে এবং বিজেপি-র বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশানা করতে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর "অপব্যবহার"-এর অভিযোগ তুলেছে। 'এক্স'-এ করা এক পোস্টে দলটি দাবি করেছে যে, তাদের অ্যাকাউন্টের সমস্ত তহবিলের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলার প্রাক্তন শাসক দল জানিয়েছে যে, তারা অনুদান সংক্রান্ত সমস্ত লেনদেনের তথ্য যথাযথভাবে নির্বাচন কমিশন ও আয়কর বিভাগের কাছে জমা দিয়েছে।

দলটি আরও বলেছে, নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ইতিমধ্যেই সরকারের কাছে রয়েছে। কারণ এই বন্ডগুলি এসবিআই-য়ের ইস্যু করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হয়েছিল।

আপাতত, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর সামনে একটি কৌতূহলের বিষয় রয়েছে যার রহস্য উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। তৃণমূলের কেন বিমান কেনার জন্য অর্থ জোগান দেবে, অথচ পরবর্তীতে সেই একই বিমান ব্যবহারের জন্য আবার ভাড়াও গুনবে?