আজকাল ওয়েবডেস্ক: কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ এখন এক নজিরবিহীন কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে। দীর্ঘদিন পর কলেজের ছাত্র সংসদ (ইউনিয়ন) কক্ষটি খুলতেই উদ্ধার হয়েছে উইপোকায় খাওয়া প্রায় এক কোটি টাকা ভর্তি দুটি বড় বাক্স। কিন্তু চমকের এখানেই শেষ ছিল না; এর কিছু ঘণ্টার মধ্যেই একে একে সামনে আসতে শুরু করে আরও হাড়হিম করা সব তথ্য। ক্যাম্পাস চত্বরের ভেতরেই সন্ধান মেলে দুটি বিলাসবহুল এসি বেডরুম, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মদের বোতল, কনডমের প্যাকেট এবং একটি আগ্নেয়াস্ত্র (রিভলভার)। রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতার এমন নগ্ন অপব্যবহারের ঘটনা সামনে আসতেই স্বভাবতই তীব্র রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে বিগত প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ ছিল এই ইউনিয়ন রুমটি। ক্যাম্পাসে কোনও নির্বাচন না হওয়ায় ২০১৫ সাল থেকেই কক্ষটি তালাবন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার রাজ্যের সব সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের তহবিলের খরচ খতিয়ে দেখার জন্য অডিটের নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মেনেই মঙ্গলবার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন রুমে সাফাই অভিযান চালাতে গিয়েই এই গুপ্তধনের হদিশ পায়। পুরোনো একটি কাঠের আলমারি থেকে বান্ডিল বান্ডিল ১০০ ও ৫০০ টাকার নোট উদ্ধার হয়, যার একটা বড় অংশ উইপোকায় নষ্ট হয়ে গেছে।
টাকা উদ্ধারের পর পুরো ক্যাম্পাসে তল্লাশি চালাতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক কঙ্কাল। কলেজের ছাদে তৈরি করা হয়েছিল দুটি আধুনিক বেডরুম, যেখানে এসি, অ্যাটাচড বাথরুম থেকে শুরু করে দামি তোশক-বালিশের সব রকম রাজকীয় ব্যবস্থা ছিল। তৎকালীন তৃণমূল জমানায় এগুলোকে 'টেরেস ফেসিলিটি' বা ছাদের সুযোগ-সুবিধা হিসেবে উদ্বোধন করা হয়েছিল। কলেজ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এই ঘরগুলো মূলত ব্যবহার করতেন তৎকালীন শাসকদল অনুমোদিত গভর্নিং বডির প্রভাবশালী সদস্য দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় (যিনি এলাকায় 'কানকাটা দেবু' নামে পরিচিত) এবং তাঁর ছেলে শিবশীষ। এমনকি কলেজের কর্মচারীদের দিয়ে তাঁদের শরীর মালিশ করানোর মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। অবশ্য দেবাশীষবাবু সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি এই ধরনের কোনও বেডরুমের অস্তিত্বের কথাই জানতেন না। এদিকে ছাদ থেকে মদের বোতল এবং কমন্স রুম থেকে কনডমের প্যাকেট মেলায় ছাত্ররাজনীতির আড়ালে ঠিক কী ধরনের চক্র চলত, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন রুম থেকে উদ্ধার হওয়া কালো প্যাকেটে মোড়ানো রিভলভারটি ইতিমধ্যেই পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে।
এই পুরো ঘটনার পেছনে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রাক্তন ছাত্রনেতা সুকান্ত বাহাদুরের নাম জড়িয়ে বড়সড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুকান্ত বাহাদুর ছিলেন এই দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল সাগরেদ। অভিযোগ, কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় কোনো অফিশিয়াল 'জেনারেল সেক্রেটারি' (জিএস) পদ না থাকলেও, সুকান্ত নিজেকে কলেজের জিএস বলেই পরিচয় দিতেন এবং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ছায়ায় দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ভর্তি প্রক্রিয়ার পুরো তোলাবাজি র্যাকেটটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য, কলেজে ভর্তি করানোর নামে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত তোলা হতো। তবে সুকান্তর দাবি, তিনি কোনো পদাধিকারী ছিলেন না এবং তাকে অহেতুক ফাঁসানো হচ্ছে। তার নাম ব্যবহার করে কিছু মানুষ এই বদনাম করার চেষ্টা করছে এবং তিনি এই লেনদেনের বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
এই ঘটনা সামনে আসতেই সুরেন্দ্রনাথ কলেজে হাজির হন বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তিনি পুরো ঘটনার ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) তদন্ত দাবি করে অভিযোগ তুলেছেন, ছাত্র সংসদের সাধারণ ফি বাবদ বছরে কখনও দেড় কোটি টাকা জমা হতে পারে না। এই কোটি কোটি টাকা আসলে গরিব ও মেধাবী পড়ুয়াদের বঞ্চিত করে চালানো ভর্তি-দুর্নীতির কালো টাকা, যা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে সরাসরি 'কালীঘাটে' পৌঁছে যেত। এই ঘটনায় কলেজের পরিবেশ কতটা কলুষিত ছিল, তা প্রকাশ করে শিক্ষকরাও জানিয়েছেন যে, ইউনিয়নের কথা না শুনলে তাঁদের নিয়মিত হুমকি ও হেনস্থার শিকার হতে হতো। ইতিমধ্যেই কলেজ কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কলেজের এক ভেন্ডার পরিতোষ দত্তর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও জোরপূর্বক ঘর দখল করে রাখার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। দীর্ঘদিনের এই রমরমা দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারি এখন যেভাবে প্রকাশ্যে আসছে, তাতে আগামী দিনে আরও অনেক রাঘববোয়ালের নাম জড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।















