আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিরল ইমিউন ডেফিসিয়েন্সি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া) রোগের চিকিৎসা ও গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করতে কলকাতায় শুরু হল প্রাইমারি ইমিউন ডেফিশিয়েন্সি বিষয়ক অষ্টম জাতীয় সম্মেলন ‘PIDCON 2026’। ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর প্রাইমারি ইমিউন ডিফিশিয়েন্সি (ISPID) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর প্রাইমারি ইমিউনোডিফিশিয়েন্সি ডিজিজেস (FPID)-এর উদ্যোগে শহরের আয়োজিত এই সম্মেলন পূর্ব ভারতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়ায় চিকিৎসা মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই সম্মেলনে ভারত-সহ বিদেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক, গবেষক এবং বিজ্ঞানীরা অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য হল বিরল ইমিউন রোগ—যা বর্তমানে ইনবর্ন এররস অব ইমিউনিটি (IEI) নামে পরিচিত, সেগুলির দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়, উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের জেনেটিক রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে রোগীরা বারবার সংক্রমণ, অটোইমিউন ডেফিসিয়েন্সি সমস্যা এবং গুরুতর প্রদাহজনিত জটিলতায় ভোগেন। কিন্তু সচেতনতার অভাব এবং জটিল উপসর্গের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগটি দীর্ঘদিন ধরা পড়ে না বা ভুলভাবে নির্ণয় হয়। ফলে চিকিৎসকদের চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়ে যায়।
এই সম্মেলনের আয়োজক সম্পাদক এবং কলকাতার ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ (ICH)-এর শিশু বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক প্রিয়ঙ্কর পাল আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে বলেন, “ইনবর্ন এররস অব ইমিউনিটির ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগের লক্ষণ একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেগুলি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে মনে হয়। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হয়ে সেই বিচ্ছিন্ন লক্ষণগুলির মধ্যে সংযোগ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। তবে একটাই কথা বলবো কথায় কথায় বাচ্চাদের অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া। রাজ্য সরকার সহযোগিতা করছে এবং পাশাপাশি আমরাও এই সম্মেলনের মাধ্যমে চেষ্টা করছি সচেতনতাকে বাড়াতে ও জটিল দিকগুলো আরও নজর দিতে।”
সম্মেলনে আমেরিকা ও ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি ভারতের খ্যাতনামা শিশু বিশেষজ্ঞ, ইমিউনোলজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট এবং ক্লিনিক্যাল জেনেটিসিস্টরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দিকনির্দেশনায় ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার প্রখ্যাত ইমিউনোডিফিশিয়েন্সি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সুধীর গুপ্তা।
পরিসংখ্যান দিক থেকে তথ্য বলছে প্রত্যেক বছর দেশে নবজাতক শিশুদের মধ্যে এই ইমিউন ডেফিসিয়েন্সি আক্রান্তের সংখ্যাটা নিহত কম নয়। বিরল রোগের মধ্যে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগ। পরিসংখ্যান গত দিক থেকে গত ২০২৪-২৫ এ প্রতি ১ হাজারের মধ্যে এক জন শিশুকে এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গিয়েছে।
এদিনের এই অনুষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জিন থেরাপির সম্ভাবনা, যা ভবিষ্যতে বহু বংশগত ইমিউন রোগের স্থায়ী চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে। পাশাপাশি দেশে হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন (HSCT) এবং বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট (BMT) পরিষেবা আরও বিস্তৃত করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে বেশি সংখ্যক রোগী জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পেতে পারেন। এছাড়াও ফ্লো সাইটোমেট্রি এবং নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (NGS)-এর মতো আধুনিক পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মিহির সরকার বলেন, “এ ধরনের রোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাচ্চাদেরই লক্ষ্য করা যায়। এটা হয় জিনগত সমস্যার কারণে। শৈশবকালেই এর প্রকাশ ঘটে, বড় বয়স পর্যন্ত বিষয়টি থেমে থাকে না। মূলত ৬ মাস, এক বা দু’বছরের মধ্যেই তার প্রকাশ ঘটে। এই ধরনের রোগ বোঝা যায় ঘনঘন সর্দি কাশি জ্বর হলে, অনেক ক্ষেত্রেই এর পর তার ভয়াবহতা বেড়ে যায়। আর তখনই তাকে ঘনঘন এন্টিবায়োটিক না দিয়ে ডাক্তারের কাছে দেখানো উচিত। তাহলেই তা নির্ধারণ করা সহজ হয়। না হলে তার ভয়াবহতা বেড়ে যায়। কখনো দেখা যায় যে নিউমোনিয়ার কারণে ভয়াবহতা বেড়ে গিয়েছে বা পুঁজ জমে গিয়েছে। ঘনঘন হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বুঝতে হবে তার জিনগত কোনও সমস্যা রয়েছে। সে ক্ষেত্রেই অবশ্যই সেই শিশুর অতি শীঘ্র পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হবে। যাতে রোগের শনাক্তরণ দ্রুত করা যায়। বলা যেতে পারে এটা এক ধরনের বিরল রোগের লক্ষণ। আর এর বিভিন্ন রকম প্রকারভেদ পর্যন্ত রয়েছে। তা পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতক ও শিশুদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়েই ইমিউন রোগের লক্ষণ শনাক্ত করা, চিকিৎসকদের জন্য মানসম্মত ডায়াগনস্টিক গাইডলাইন তৈরি করা এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোই আগামী দিনের বড় লক্ষ্য।
চিকিৎসা মহলের মতে, PIDCON 2026 শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলন নয়, বরং বিরল ইমিউন রোগের চিকিৎসা ও গবেষণায় কলকাতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দিকেও বড় পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বহুমুখী চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশে বিরল ইমিউন রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে এই উদ্যোগ।
