আজকাল ওয়েবডেস্ক: ১০ ফেব্রুয়ারি। প্রতিবছর, এই ১০ ফেব্রুয়ারি বৈদেশিক বিষয়ে দেশের সেবাকারীদের সম্মানে রাশিয়া পালন করে ডিপ্লোমেটিক ওয়ার্কারস ডে। এই বিশেষ দিনটিতে রাশিয়ান কূটনীতিকদের পেশাগত সাফল্যকে সম্মান জানাতে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তাদের ভূমিকার স্বীকৃতি দিতে পালন করা হয়ে  থাকে। কেন এই সম্মান প্রদর্শন, কেমন ছিল গোড়ার দিকের কথা? সেসব বিষয়, নানা অজানা তথ্য নিয়েই এই প্রতিবেদন। তার সঙ্গেই, এমন একজনের কাহিনি রইল এই প্রতিবেদনে, যিনি কঠিন কূটনীতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন কবিতার ছন্দকে, আবেগকে, যিনি বহু বছর আগে ভারতের মনের গভীরতাকে খুঁজে পেয়েছিলেন। পরাধীন ভারতের বুকের ক্ষত দেখে বুঝেছিলেন, এই দেশ একদিন সকল শিকল ভাঙবেই। 

প্রথমেই বলা যাক, কেন এই বিশেষ দিন পালনের জন্য রাশিয়া বেছে নিয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারিকেই? তথ্য, ১৫৪৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রথম বৈদেশিক নীতি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ ফরেন পলিসি ইনস্টিটিউশন পোসোলস্কি প্রিকাজ (দূতাবাস)-এ জার ইভান দ্য টেরিবলের অধীনে একটি কূটনৈতিক ঐতিহ্যের পথচলার সূচনা হয়। পরবর্তীকালে, ১৮০২ সালে আলেকজান্ডার প্রথমের অধীনে তা আধুনিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রূপান্তরিত হয়। সেই কারণেই, এই বিশেষ দিনটি পালিত হয় ১০ ফেব্রুয়ারি, তথ্য তেমনটাই।

এই দিনে, রাশিয়া স্মরণ করে তাঁদের কথা, যাঁরা দেশের জন্য কাজ করেছেন, দেশের বাইরে, অন্যান্য দেশে থেকে। এই দীর্ঘ সময়কালে রাশিয়া নানা সময়ে পেয়েছে বহু কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বককে। এই ১০ ফেব্রুয়ারি, ফিরে দেখা তাঁদের মধ্যের একজন,  কনস্টান্টিন দিমিত্রিভিচ নাবোকভ। তাঁকে  এখনও ভুলতে পারেনি এই বিদেশ বিভুঁইয়ের কলকাতাও। যিনি, কলকাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত প্রথম রাশিয়ান কনসোল জেনারেল। ১৯১২-১৯১৫, কলকাতায়, এই পদে কাজ করেছেন। জাঁকজমকের ব্রিটিশ শাসনের যে শহরে পা দিয়েই তিনি অনুভব করেছিলেন দারিদ্র, ক্ষুধার জ্বালাকে। বুঝতে পেরেছিলেন কলকাতা নামক শহরের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, লন্ডন বানানোর বাসনাকে। প্রাচীন সভ্যতার ছাঁচ, শ্বাসকে জোর করে চাপা দেওয়া হয়েছে  'ঔপনিবেশক শাসন' ব্যবস্থার নীচে। শুধু কলকাতা নয়, দার্জিলিং থেকে দিল্লি, ঘুরে ঘুরে দীর্ঘশ্বাস শুনেছেন যেন, তা লিখে রেখেছিলেন নিজের নোটবুকের পাতায়, বন্ধুদের লেখা চিঠিতে। 

কনস্টান্টিন নাবোকভের বাবা ছিলেন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আলেকজেন্ডারের সময়ের বিচারমন্ত্রী দিমিত্রি নাবোকভ। তাঁর ছেলেই কনস্টান্টিন নাবোকভ। যিনি ভারতে নিযুক্ত প্রথম রাশিয়ান কনসোল জেনারেল, তথ্য তেমনটাই। যদিও ভারতে আসার আগে, কনস্টান্টিন নাবোকভ কাজ করে ফেলেছেন তাঁর দেশের বাইরে বহু জায়গায়। সেন্ট পিটার্সবার্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ব্রাসেলস এবং ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক পদ, পোর্টসমাউথে শান্তি আলোচনা, সের্গেই উইটের সঙ্গে কাজ করে ফেলেছেন। সখ্যতা গড়ে উঠেছে নানা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে। আদ্যন্ত এক শিল্পী মানুষ, ততদিনে নিজের লেখালিখির পাশাপাশি মন দিয়েছিলেন অনুবাদ সাহিত্যেও। একদিকে শিল্প অন্যদিকে রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব, দুইয়ের নিঁখুত মেলবন্ধন যেন পরতে পরতে ফুটে উঠত তাঁর বাস্তব জীবনে, চরিত্রে। 

১৯১২ সাল। বহু দেশ ঘুরে নাবোকভকে রাশিয়া পাঠায় ভারতে। ভারতে আসতে হবে? শুনে তাঁর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল জানেন? 'The Ordeal Of a Diplomant'(১৯২১)-এ তিনি লিখেছেন, ভারতে আসতে হবে শুনে, রাশিয়ার যুবকের মনে হয়েছিল, কোনও দেশ নয়, তাঁকে বুঝি বা পাঠানো হচ্ছে মঙ্গলগ্রহে। তখনও তিনি জানতেন না, এই ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়েই তাঁর আত্মোপলব্ধি ঘটবে। আমুল বদলে যাবে জীবনকে দেখার আঙ্গিকই।

কনস্টান্টিন যখন ভারতে আসছেন, তখন ভারত ব্রিটিশ অধীন। পরাধীন দেশেও তখন টালমাটাল পরিস্থিতি। পঞ্চম জর্জ কলকাতা থেকে দিল্লি স্থানান্তরিত করছেন দেশের রাজধানী। কিন্তু রাজধানী বদলে গেলেও, উল্লেখযোগ্যভাবে রাশিয়ান কনস্যুলেট মুম্বই অর্থাৎ তৎকালীন বোম্বে থেকে চলে আসে কলকাতায়। ফলে নাবোকভের পোস্টিং হয়, তাঁর কল্পনায় সেই সময় থাকা 'মঙ্গল গ্রহ'-এর কলকাতা নামক এক জায়গায়। পরে তিনি লিখেছিলেন, যখন তৎকালীন ভারতে থাকা ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে কলকাতায় পাঠানো হয়, তিনি অবাক হয়ে দেখেন, সরকার ব্যাপারটি কলকাতা থেকে সরে গিয়েছে অন্য জায়গায়। বিষয়টির মধ্যে হাস্যরস খুঁজে পাওয়া গেলেও, তা যে সেই সময়ের এক চরম পরিস্থিতি তুলে ধরেছে ব্যাঙ্গেও মোড়কে, তাও সহজে অনুমেয়।


  কনস্টান্টিন নাবোকভ কলকাতায় এলেন যখন, তখন দু'দেশের সীমিত অর্থনৈতিক, চা-তেল আমদানি-রপ্তানির সম্পর্ক‌ নিয়েও টানাপোড়েন। তাঁর মূল কাজ ছিল ১৯০৫ পরবর্তী সময়ে দু'দেশের বাণিজ্য, সামাজিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, রিপোর্ট পাঠানো। তিনি এলেন ঠিকই। কিন্তু স্থানীয় ভাষা ছিল তাঁর বোধগম্যের একেবারে বাইরে। অন্যদিকে ভারতের মতো দেশ, যা তখন অন্য দেশের পরাধীনতায়। জটিল পরিস্থিতিতে নাবোকভের সহায় হয়েছিল, তাঁর কাব্যিক, অনুভূতিশীল মন। ইউরোপীয় শিক্ষা এবং রাশিয়ান নৈতিক কল্পনাশক্তি এবং কাব্যিক মন দিয়েই তিনি একে একে বুঝে নিতে শুরু করেন চারপাশের কঠিন সত্যকে।

 

 

কলকাতায় এসে তাঁর ঠিকানা হয়, এজরা ম্যানশন। বাসভবনের জানলা দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতেন তৎকালীন ভারতের ভাইসরয়ের বাসভবন, সাদা গম্বুজ। আর তাঁর মন ধীরে ধীরে পেরিয়ে যেন সাদা গম্বুজের ওপারে। তিনি বুঝতে পারতেন, ওপারের ওপার নীরবতাকে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন একটি কঠোর সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিল সামনে। ওই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশী কূটনীতিকদের, বিশেষ করে অ-সাম্রাজ্যবাদী মিত্রদের সন্দেহের চোখে দেখা হত বহু ক্ষেত্রেই। যদিও  তিনি তখন কুটনীতি, বিদেশনীতির বাইরে খোঁজ পেয়েছেন জীবন সত্যের। দিল্লি কিংবা কলকাতা, দেশের যে কোনও জায়গা থেকে তিনি যখনই কোনও চিঠি লিখেছেন, তাতে শুধু রুক্ষ, কঠোর কূটনীতিক হিসেবে পাতার পর পাতা লিখে যাননি নাবোকভ, লিখেছেন একজন আদ্যোপান্ত শিল্পী মন নিয়ে। নইলে কোনও দেশের কূটনীতিক, কনসোল জেনারেল লিখতে পারেন, 'এমনকী নীরবতাও আলাদা এখানে।' লিখতে পারেন,  'এমন একটি সভ্যতা যা অনন্তকালের সাথে বাঁচতে শিখেছে।'

১৯১৪। বিশযুদ্ধ। সেই সময়ে আরও ব্যাপক আকারে কাজ করার সুযোগ পান নাবোকভ। কনস্যুলেটটি পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ান প্রজাদের জন্য তথ্য ও সমন্বয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং তার মধ্যস্থতার মাধ্যমে, ভারতে ভাইসরয়ের কার্যালয় পেট্রোগ্রাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে। তিনি রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সমর্থনে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগও সংগঠিত করেন। নাবোকভের এই সময়ে লেখা চিঠিগুলি একপ্রকার ঐতিহাসিক দলিল। সাধারণ ভারতীয়দের মর্যাদা এবং সহনশীলতার কথা তিনি তুলে ধরেন চিঠিতে, এবং ভারত স্বাধীন হওয়ার বহু আগেই, তিনি তাঁর চিঠিতে বারে বারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, যে কোনও সাম্রাজ্য নৈতিক বৈধতা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য শাসন করতে পারে না। 

গভীর উপলব্ধি নিয়ে তিনি ভারত ছেড়েছিলেন। যে কূটনীতিক এসেছিলেন ভারতে, রুক্ষ রাজনীতীর উপর তীক্ষ্ম নজর রাখতে, তিনি তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে লিখেছিলেন, 'ওনলি মিউজিক ক্যান এক্সপ্রেস ইটস পোয়েট্রি, ফর বিউটি হেয়ার ইস নট আ ফর্ম- ইট ইস আ প্রেজেন্স, অ্যান্ড ইন দ্যাট প্রেজেন্স, অল প্রাইড অ্যান্ড ডিফারেন্স ফল অ্যাওয়ে।' একজন প্রায় বিস্মৃত হওয়া কূটনীতিককে স্মরণ করার জন্য, তাঁর মন বোঝার জন্য, যথেষ্ট নয় লাইনগুলি?