আজকাল ওয়েবডেস্ক: ওয়াশিংটনের সরাসরি নজরদারির মধ্যে ভেনেজুয়েলাকে একটি দীর্ঘ, ধাপে ধাপে রূপান্তরের পথে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, দেশটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল কোনও তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে নির্বাচন এখনই অগ্রাধিকার নয়। তার বদলে স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি  এবং তারপর রাজনৈতিক রূপান্তর- এই তিন ধাপে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

রুবিও স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় দ্রুত ভোট বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চায় না। তার মতে, বহু বছরের প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন ও অর্থনৈতিক সংকট এক বা দুই বছরে সারানো সম্ভব নয়। তাই প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে দেশটিকে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার হাত থেকে বাঁচানো। নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীল রাখা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।

এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। নিষেধাজ্ঞা এবং সমুদ্রের ওপর নজরদারির মাধ্যমে তেল রপ্তানির ওপর কার্যত ওয়াশিংটনের দখলই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রভাবশক্তি বলে মনে করছে ট্রাম্প প্রশাসন। রুবিওর দাবি, এই তেল নির্ভর পদ্ধতি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের ওপর যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দেয়।

স্থিতিশীলতার পরের ধাপ হিসেবে অর্থনীতি চাঙ্গা করার কথা বলা হয়েছে। এই পর্যায়ে ভেনেজুয়েলার বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন ও পশ্চিমী  সংস্থাগুলির পাশাপাশি অনুমোদিত বিদেশি কোম্পানিকে তেল ও পরিকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, নির্মাণকাজ শুরু এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ফেরানো এই পর্যায়ের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানো, বিরোধী নেতাদের মুক্তি বা ক্ষমা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে দেশ ছেড়ে যাওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও এই ধাপে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তন বা নির্বাচন এই প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে রাখা হয়েছে। রুবিও কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে অস্বীকার করে বলেন, বাস্তবতা অনুযায়ী ধাপগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তার মতে, দ্রুত নির্বাচন চাপিয়ে দিলে একটি সংকটে থাকা  রাষ্ট্র আরও ভেঙে পড়তে পারে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ধৈর্য ও দীর্ঘস্থায়ী পথ বেছে নিয়েছে।

এই পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা অভিযোগ তুলেছেন, প্রশাসন একাধিক কাঠামোর কথা বললেও ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। তবে হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, কংগ্রেসের সঙ্গে বিস্তারিত পরিকল্পনা ভাগ করা হয়েছে এবং নির্বাচনকে আগেভাগে চাপিয়ে দেওয়াই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলবে।

এই কৌশলের প্রভাব শুধু লাতিন আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, যার প্রভাব ভারতের মতো তেল আমদানি নির্ভর দেশগুলির ওপরও পড়তে পারে। তেলের সরবরাহ ও দামের ভারসাম্যে এই নীতির প্রতিফলন আগামী কয়েক বছর ধরে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত কৌশলকেই সামনে আনে, অর্থনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। একই সঙ্গে এটি লাতিন আমেরিকায় চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব ঠেকানোর কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ তাই দ্রুত নয়, বরং ধীরে ধীরে, ধাপ ধরে লেখা হবে—ওয়াশিংটনের নজরদারির মধ্যেই।