আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেনেজুয়েলায় নতুন করে সামরিক হস্তক্ষেপের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন দাবিদাওয়া মেনে না চললে ওয়াশিংটন ফের “দ্বিতীয় দফার” বা “সেকেন্ড ওয়েভ” সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত। ইতিমধ্যেই নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয়ভাবে আটক করার পর যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির “নিয়ন্ত্রণে” রয়েছে বলেও দাবি করেছেন ট্রাম্প।
এক সাংবাদিক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলাকে ঠিক করা এখন আমাদের দায়িত্ব। ওরা যদি ঠিকভাবে আচরণ না করে, তাহলে আমরা দ্বিতীয় হামলা চালাব। আমরা প্রস্তুত, যদিও আশা করি সেটার প্রয়োজন হবে না।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন কে এখন ক্ষমতায়, আমি উত্তর দিতে পারি—কিন্তু সেটা খুবই বিতর্কিত হবে,” এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের কথাই কার্যত স্বীকার করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প জানান, সাম্প্রতিক অভিযানে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সব সেনাকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
“কেউ মারা যায়নি। যারা আহত হয়েছিল, তারা সবাই এখন ভালো আছে,” বলে দাবি করেন তিনি। তিনি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফার অভিযানের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল, “সবকিছু তৈরি ছিল, কিন্তু আপাতত আমরা পিছিয়ে এসেছি।”
ভেনেজুয়েলাকে “এই মুহূর্তে একটি মৃত দেশ” বলে বর্ণনা করে ট্রাম্প দেশটির অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য বছরের পর বছর ধরে চলা ‘অব্যবস্থাপনা’র দায় চাপান মাদুরো প্রশাসনের উপর। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের উপর মার্কিন আগ্রহও স্পষ্ট করে দেন।
ট্রাম্প বলেন, “তেল উৎপাদন এখন খুব কম। আমাদের ভেনেজুয়েলার তেল ও অন্যান্য সম্পদের উপর পূর্ণ অধিকার দরকার।”
তিনি দাবি করেন, মার্কিন তেল সংস্থাগুলি ভেনেজুয়েলার তেল পরিকাঠামো পুনর্গঠনে প্রস্তুত। “আগে আমেরিকান কোম্পানিগুলিই এই তেল শিল্প গড়ে তুলেছিল। পরে সেটা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।”
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রেখেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যদি মার্কিন শর্তে রাজি না হন, তবে নতুন করে সামরিক হস্তক্ষেপ হতে পারে।
যদিও প্রকাশ্যে রদ্রিগেজ মাদুরোকে আটক করার ঘটনাকে “নৃশংসতা” বলে নিন্দা করেছেন, ট্রাম্প দাবি করেন, আড়ালে কথাবার্তা চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথোপকথনে রদ্রিগেজ নাকি বলেছেন, “আপনারা যা চাইবেন, আমরা সেটাই করব।”
এই প্রসঙ্গে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, “ওর আসলে আর কোনও বিকল্প নেই।”
কারাকাসে সরকার ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব মাদুরোর অবিলম্বে প্রত্যাবর্তনের দাবি তুললেও আপাতত ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে সমর্থনের কথা জানিয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ জনগণকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আহ্বান জানালেও মার্কিন অভিযানে সেনা ও সাধারণ নাগরিক নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলে একে “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন” বলে আখ্যা দেন।
মাদুরোর ছেলে নিকোলাস এরনেস্তো মাদুরো গেরা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, স্পেনে নির্বাসিত বিরোধী নেতা এদমুন্দো গঞ্জালেস উরুতিয়া বলেন, “এটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কিন্তু যথেষ্ট নয়।”
ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্পেন, ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও উরুগুয়ে একযোগে সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন এই পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে নতুন হামলার আশঙ্কায় সুপারমার্কেট ও ওষুধের দোকানে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। প্রতিবেশী কলম্বিয়ায় পরিস্থিতির অবনতি আশঙ্কায় প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো পূর্ব সীমান্তে ৩০ হাজার সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে এই সংঘাত শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট নয়, বরং গোটা লাতিন আমেরিকায় নতুন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা হতে পারে।
