আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেনেজুয়েলার ওপর তেলকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রশাসনের পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে হোয়াইট হাউসের শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত ভেনেজুয়েলাকে নতুন করে তেল উত্তোলন বা রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে না।
মার্কিন শর্তের প্রথম ধাপ হিসেবে ভেনেজুয়েলাকে চীন, রাশিয়া, ইরান ও কিউবার সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি এসব দেশকে কার্যত ভেনেজুয়েলা থেকে ‘বের করে দেওয়ার’ দাবি জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় শর্ত অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলাকে তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই অংশীদার হতে হবে এবং ভারী অপরিশোধিত তেল বিক্রির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সূত্রের দাবি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার কংগ্রেস সদস্যদের একটি গোপন ব্রিফিংয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে তারা ভেনেজুয়েলাকে বাধ্য করতে পারবে, কারণ দেশটির অধিকাংশ তেল ট্যাঙ্কার ইতিমধ্যেই পূর্ণ। রুবিও আরও বলেন, তেল বিক্রি বন্ধ থাকলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেনেজুয়েলা কার্যত আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়তে পারে।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য যে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার। এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাঙ্কারের চলাচল নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। তাঁর ভাষায়, “সরকার তেল নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়- জাহাজ, ট্যাঙ্কার সবকিছুর দায়িত্ব নেবে। এর একটিও হাভানায় যাবে না।” উইকার দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার কাছে এই মুহূর্তে নতুন করে তেল পাঠানোর মতো কোনও খালি ট্যাঙ্কার নেই।
হোয়াইট হাউস এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিরোধিতা করেনি। বরং এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট ভেনেজুয়েলায় অবশিষ্ট শক্তিগুলোর ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কথা বলছেন, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করে অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করে, মাদক পাচার রোধ করে, তেল পরিকাঠামো পুনরুজ্জীবিত করে এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থে কাজ করে।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রকে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল হস্তান্তর করবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই তেল বাজারদরে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করবেন, যাতে তা ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের জনগণের উপকারে আসে।
ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, এই পরিকল্পনায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের কোনও বিষয় নেই। রজার উইকার বলেন, “এটা কোনওভাবেই ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’-এর প্রশ্ন নয়।” এর আগেও ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি ভেনেজুয়েলায় যাতায়াতকারী সব ‘নিষেধাজ্ঞাভুক্ত’ তেল ট্যাঙ্কারের ওপর সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। পরদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, এটি আসলে একটি অবরোধ, যাদের যাওয়ার কথা নয়, তাদের যেতে দেওয়া হবে না।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল বাস্তবায়িত হলে শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
