আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশে ভগবান শ্রীরামের একটি ছবি অবমাননার অভিযোগ এবং রংপুরে তাঁর দেশের সর্বোচ্চ মূর্তি নির্মাণে কট্টরপন্থী ইসলামপন্থীদের বাধার জেরে রাজধানী ঢাকা উত্তাল হয়ে উঠেছে। মূর্তি নির্মাণের কাজ আপাতত স্থগিত হওয়ার পর, শুক্রবার ঢাকায় হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী মশাল মিছিল করেন এবং 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনি দিয়ে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

উত্তরাঞ্চলীয় গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়িতে ৮১ ফুট উঁচু শ্রীরামের মূর্তি নির্মাণের কাজ স্থগিত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই এই নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হল। প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির কমিটির দাবি, ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে তারা ক্রমাগত হুমকি পাচ্ছিল। এই ঘটনা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে ফের গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। শুক্রবার বেশ কয়েকটি হিন্দু সংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ শাহবাগ মোড়ে জড়ো হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের দিকে এগিয়ে যান। এই প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিল হিন্দু মহাজোট। সংগঠনটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধনের আয়োজন করে, অন্যদিকে আরেকটি অংশ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ভবনের কাছে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এদিকে, রংপুরে হিন্দুদের একটি বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশের বাধার কারণে সামান্য ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটেছে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, চলতি মাসের শুরুতে গাইবান্ধায় একটি বিক্ষোভ চলাকালীন একদল ইসলামি কট্টরপন্থী শ্রীরামের একটি ছবিতে জুতো রেখে অবমাননা করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভকারীরা জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। এই দাবি পূরণ না হলে হিন্দু সম্প্রদায় আরও বৃহত্তর সমাবেশ ও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। শনিবার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রক  একটি স্মারকলিপিও জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া, হিন্দু মহাজোট কঠোর ভাষায় জানিয়েছে যে, শ্রীরামের মূর্তি নির্মাণের কাজ আবার শুরু করতে না দেওয়া হলে তারা বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটিতে একটি করে রাম মন্দির নির্মাণ করবে। শনিবার বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেশব্যাপী আন্দোলনের ঘোষণার মাধ্যমে এই বিক্ষোভ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পলাশবাড়িতে একটি বিশাল মন্দির কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে শ্রীরামের মূর্তিটি নির্মিত হচ্ছিল, যার প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৫০ ফুট উঁচু ভগবান কৃষ্ণ এবং ৩০ ফুট উঁচু ভগবান শিবের মূর্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির কমিটির সভাপতি হরিদাস চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, ইসলামি গোষ্ঠীগুলো প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হুমকি দেওয়ার পরই নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি একজন কট্টরপন্থী ইসলামি বক্তা বুলডোজার দিয়ে মূর্তিটি ভেঙে ফেলারও হুমকি দিয়েছিলেন। ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটানোর কথা জানিয়ে হরিদাস দাস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান আরাধ্য দেবতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবেই এই মূর্তি নির্মাণ করা হচ্ছিল।

অন্যদিকে, মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামলাল কুমার মহান্ত এক বিবৃতিতে জানান, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থেই তারা আপাতত কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা চান না এটি নতুন করে কোনো বিবাদের কারণ হোক বা কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগুক।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং তারা দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। পূর্ববর্তী মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলের সংকটের পর সম্প্রতি হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে ১৩৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবশ্য বারবার আশ্বাস দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে সবার নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। তাঁর প্রথম জাতীয় ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ধর্ম যার যার হলেও এই দেশ সবার। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সরকারের এই আশ্বাসের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।