আজকাল ওয়েবডেস্ক: জোরালো কণ্ঠ কি পুরুষত্বের আসল চিহ্ন? মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে বসবাসকারী হাউলার বানরদের নিয়ে হওয়া একটি নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই বিতর্কে একেবারে ভিন্ন আলো ফেলেছে। গবেষকদের স্পষ্ট বক্তব্য—একসঙ্গে খুব জোরে ডাক দেওয়া আর বিপুল পরিমাণ শুক্রাণু উৎপাদন করা, দুটোই করা প্রায় অসম্ভব। শক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃতি পুরুষ হাউলারদের বাধ্য করে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবিদ জ্যাকব ডানের নেতৃত্বে এই গবেষণা সম্প্রতি কারেন্ট বায়োলজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্ববিদ ডন কিচেন বলেন, এটি বহুদিন ধরেই প্রয়োজনীয় ছিল এবং ফলাফল স্পষ্টভাবে একটি বিবর্তনীয় ‘ট্রেড-অফ’-এর দিকে ইঙ্গিত করে।
হাউলার বানররা তাদের ভয়ংকর জোরালো ডাকার জন্য বিখ্যাত। তাদের হাঁক এতটাই শক্তিশালী যে পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায় এবং অনেক সময় একটানা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলতে পারে। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, এই হাঁক মূলত অন্য দলের পুরুষদের ভয় দেখিয়ে দূরে রাখার কৌশল। এই কণ্ঠস্বরের মূল ভৌত ভিত্তি হলো হাইয়য়েড নামের একটি U-আকৃতির হাড়, যা জিভ ও ল্যারিংক্সকে ধরে রাখে। বিভিন্ন প্রজাতির হাউলার বানরের মধ্যে এই হাইয়য়েডের আকারে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়—কিছু প্রজাতিতে এটি অত্যন্ত ছোট, আবার কিছু প্রজাতিতে অস্বাভাবিকভাবে বড়।
একই রকম পার্থক্য দেখা যায় টেস্টিসের আকারেও। কোনও কোনও প্রজাতিতে টেস্টিস তুলনামূলক ছোট, আবার কোথাও তা অনেক বড়। দেহের সামগ্রিক আকারের তারতম্য হিসাব করেও এই পার্থক্য অটুট থাকে। গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ইউরোপের বিভিন্ন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত নয়টি প্রজাতির ১৪৪টি পুরুষ হাউলার বানরের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। আধুনিক লেজার স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাইয়য়েডের ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা হয় এবং আগে রেকর্ড করা ডাক বিশ্লেষণ করে কণ্ঠের গভীরতা মাপা হয়।
গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেখা যায়, যেসব প্রজাতির হাইয়য়েড বড়, তাদের ডাক বেশি গভীর ও রেজোন্যান্ট। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বিপরীত সম্পর্কও স্পষ্ট হয়—হাইয়য়েড যত বড়, টেস্টিস তত ছোট। অর্থাৎ, যেসব প্রজাতির পুরুষরা সবচেয়ে জোরে হাঁক দিতে পারে, তাদের শুক্রাণু উৎপাদনের ক্ষমতা তুলনামূলক কম।
এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামাজিক কাঠামোরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেসব হাউলার প্রজাতিতে একটি দলে মাত্র একজন পুরুষ থাকে, সেখানে সেই পুরুষের হাইয়য়েড বড় এবং টেস্টিস ছোট হয়। কারণ সে মূলত বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখিয়ে স্ত্রীদের উপর নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। বিপরীতে, যেসব দলে দুই বা তিনজন পুরুষ থাকে, সেখানে হাঁক দিয়ে লাভ কম। সেখানে প্রতিযোগিতা হয় দলের ভেতরেই, ফলে পুরুষরা বেশি শক্তি ব্যয় করে শুক্রাণু উৎপাদনে—যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘স্পার্ম কম্পিটিশন’।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল দেখায় যে পুরুষত্বের বিভিন্ন দিকের মধ্যে প্রকৃতিগত ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা কঠিন। শুক্রাণু উৎপাদন মোটেও সস্তা বা সহজ প্রক্রিয়া নয়, আবার দীর্ঘ সময় ধরে জোরে হাঁক দেওয়াও অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। তাই প্রকৃতি একসঙ্গে সব সুবিধা দেয় না।
এই গবেষণা শুধু হাউলার বানরদের আচরণই নয়, বরং প্রাণীদের সামাজিক সংগঠন ও বিবর্তনীয় কৌশল বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জঙ্গলের এই জোরালো কণ্ঠস্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে শক্তি, প্রতিযোগিতা আর টিকে থাকার এক জটিল হিসাব।
