আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনের সামরিক তৎপরতা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি এবং তেহরানের পাল্টা কড়া অবস্থান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সংঘর্ষের আশঙ্কা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। যদিও একই সঙ্গে দুই দেশই আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ হুইটেকার জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত ইরানকে সম্ভাব্য সংঘাত থেকে সরে আসার জন্য কিছুটা সময় দিচ্ছেন। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই ধৈর্য চিরস্থায়ী নয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই বলেছেন, “সব বিকল্পই আমাদের হাতে রয়েছে”—যা সরাসরি সামরিক সংঘাতের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়েছে—যদি দেশটিতে হামলা চালানো হয়, তবে গোটা অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তেহরান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেনাবাহিনীগুলিকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যা কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই পরিস্থিতির সূত্রপাত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোকে কেন্দ্র করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একের পর এক হস্তক্ষেপের হুমকি দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে অতিরিক্ত নৌবহর। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর নেতৃত্বে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে ইরানের উপকূলের কাছে। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরান সরকার সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা করছে এবং একই সঙ্গে তিনি নতুন করে একটি পারমাণবিক চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছেন।
শনিবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান “গুরুত্বের সঙ্গে” ওয়াশিংটনের সঙ্গে কথা বলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তেহরান শেষ পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করতে রাজি হবে। যদিও ইরান বরাবরের মতোই এই বক্তব্যের সঙ্গে শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যদি দেশটির উপর হামলা হয়, তবে তার জবাব হবে “দৃঢ় ও নির্ধারিত”। তিনি বলেন, হুমকি দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসানো যাবে না। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, বড় ধরনের সংঘর্ষ হলে ক্ষতি হবে উভয় দেশেরই।
মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে ফোনালাপে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান কখনও যুদ্ধ চায়নি এবং এখনও চায় না। তাঁর কথায়, “যুদ্ধ ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা এই অঞ্চলের কারও স্বার্থে নয়।” তবে এই শান্তিপূর্ণ বক্তব্যের পাশাপাশিই ইরানি সেনাবাহিনীর প্রধান আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ যদি ভুল করে, তাহলে তা গোটা অঞ্চল এবং ‘জায়নিস্ট রাষ্ট্রের’ নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করবে।
এই উত্তেজনার মধ্যে শনিবার ইরানের বন্দর শহর বান্দার আব্বাসে একটি আবাসিক ভবনে বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় দমকল কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি গ্যাস লিকের কারণে ঘটে এবং এর সঙ্গে কোনও হামলা বা নাশকতার যোগ নেই। দেশের অন্য অংশেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর পাওয়া গেলেও, সেগুলিকে সরাসরি বর্তমান সংকটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি দুই পক্ষই আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরান পারমাণবিক আলোচনা করতে প্রস্তুত, তবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনও আলোচনার বিষয় হবে না। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুরস্কও পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে ইরানের ভেতরের পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। গত ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন HRANA। তাদের মতে, নিহতদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ইরান অবশ্য এই বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেই দায়ী করছে এবং বলছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপে’ রূপ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই টানাপোড়েন শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই—এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। আলোচনা ও সংঘাত—দুই পথই খোলা থাকলেও, আগামী কয়েক সপ্তাহ যে অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে চলেছে, তা স্পষ্ট।
