আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন বিচার দপ্তরের (DOJ) প্রকাশিত সর্বশেষ ‘এপস্টাইন ফাইলস’ ঘিরে ব্রিটিশ রাজপরিবারে নতুন করে অস্বস্তি ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত নথিগুলির মধ্যে থাকা কিছু ছবি ও ইমেল আদান–প্রদান ফের আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে ব্রিটেনের বিতর্কিত রাজপুত্র অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরকে—যিনি একসময় প্রিন্স অ্যান্ড্রু নামে পরিচিত ছিলেন।

নথিতে প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর মেঝেতে শুয়ে থাকা এক মহিলা বা কিশোরীর উপর ঝুঁকে রয়েছেন। ছবিগুলিতে ওই ব্যক্তির মুখ ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে। একটি ছবিতে দেখা যায়, তিনি ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছেন, অন্য একটি ছবিতে তার হাত ওই ব্যক্তির পেটের উপর রাখা। পেছনের দৃশ্যে আরও একজন অচিহ্নিত ব্যক্তিকে দেখা যায়, যিনি একটি টেবিলের উপর পা তুলে রেখেছেন—টেবিলে রাখা রয়েছে গুছিয়ে রাখা তোয়ালে। ছবিগুলির কোনও তারিখ, স্থান বা প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা নথিতে উল্লেখ করা হয়নি।

এই ছবি প্রকাশ্যে আসার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন, মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর যেন মার্কিন কংগ্রেসের সামনে হাজির হয়ে প্রয়াত ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সাক্ষ্য দেন। জাপান সফরে থাকা অবস্থায় শনিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্টার্মার বলেন, “এপস্টাইনের শিকারদের কথাই সবচেয়ে আগে ভাবতে হবে। আপনি যদি সত্যিই ভুক্তভোগীদের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চান, তাহলে এ ধরনের সাক্ষ্যের মুখোমুখি হতে পিছপা হওয়া যায় না।”

সর্বশেষ নথিতে ২০১০ সালের আগস্ট মাসের একটি ইমেল আদান–প্রদানও প্রকাশিত হয়েছে। ওই ইমেলে এপস্টাইন লন্ডনে একটি নৈশভোজে অংশ নেওয়ার জন্য মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরকে আমন্ত্রণ জানান এবং এক ‘বন্ধু’র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। উত্তরে মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর লেখেন, তিনি “তাকে দেখতে পেয়ে আনন্দিত হবেন” এবং এপস্টাইনকে অনুরোধ করেন তার যোগাযোগের তথ্য ওই মহিলাকে দিতে।

এরপর এপস্টাইন ওই মহিলাকে ২৬ বছর বয়সী এক রুশ নাগরিক হিসেবে বর্ণনা করেন—যিনি “চালাক, সুন্দর এবং বিশ্বাসযোগ্য”—এবং জানান যে তার কাছে মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরের ইমেল ঠিকানা রয়েছে। এই ইমেলগুলির সময়কাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর দু’বছর আগেই এপস্টাইন নাবালিকার সঙ্গে যৌন অপরাধের দায়ে দোষ স্বীকার করেছিলেন।

আরও কিছু ইমেলে দেখা যায়, এক মাস পর দু’জন লন্ডনে দেখা করার পরিকল্পনা করছেন। সেখানে মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের প্রস্তাব দেন, যেখানে “পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা” থাকবে। এপস্টাইন জবাবে লেখেন, তাঁদের “ব্যক্তিগত সময়ের প্রয়োজন হবে।”

যদিও প্রকাশিত ছবি ও ইমেলগুলিতে সরাসরি কোনও অপরাধের প্রমাণ নেই, তবুও এগুলি মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরের ভূমিকা ও এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। সিএনএন জানিয়েছে, তারা মন্তব্যের জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে।

মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর বরাবরই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। ২০১৯ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, ২০১০ সালেই এপস্টাইনের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং কখনও এপস্টাইনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির কোনও ইঙ্গিত পাননি।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে জেফ্রি এপস্টাইন কারাগারে আত্মহত্যা করেন। তার মৃত্যুর পর থেকেই তার যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের নিয়ে তদন্ত চলেছে। সর্বশেষ এই নথিপত্র প্রকাশ করা হয়েছে কংগ্রেস নির্ধারিত সময়সীমা পেরোনোর ছয় সপ্তাহ পর।

এপস্টাইন কেলেঙ্কারির জেরে গত বছর এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেন রাজা চার্লস। তিনি তার ভাই মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরের রাজকীয় উপাধি, সম্মান ও আনুষ্ঠানিক মর্যাদা কেড়ে নেন এবং তাকে উইন্ডসরের বাসভবন ছাড়তেও বাধ্য করেন।

এর আগে, গত নভেম্বর মাসে মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্য মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরকে ওয়াশিংটনে এসে তদন্তে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। এক প্রকাশ্য চিঠিতে তাঁরা বলেন, তার সাক্ষ্য এপস্টাইনের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের পথে সহায়ক হতে পারে। যদিও আইনপ্রণেতাদের তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা নেই।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য এই বিষয়ে অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আগে স্টার্মার বলেছিলেন, তিনি এই প্রশ্নে সরাসরি মন্তব্য করতে চান না। বাকিংহাম প্যালেস শনিবার নতুন করে কোনও বিবৃতি দেয়নি; পরিবর্তে তারা ২০২৫ সালের অক্টোবরে জারি করা পুরনো বিবৃতির দিকেই ইঙ্গিত করেছে।

এর আগেও প্রকাশিত নথিতে দেখা গিয়েছে, এপস্টাইনের তৎকালীন সঙ্গী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গেও মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরের যোগাযোগ ছিল। একটি ইমেলে, ২০০১ সালে স্কটল্যান্ডের রাজকীয় বাসভবন থেকে পাঠানো এক বার্তায় রাজপরিবারের এক সদস্য ম্যাক্সওয়েলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি কি “নতুন অনুপযুক্ত বন্ধু” খুঁজে পেয়েছেন। অন্য একটি ইমেল থেকে ইঙ্গিত মেলে, ম্যাক্সওয়েল পেরু সফরের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন, যেখানে ‘মেয়েদের’ কথাও উল্লেখ ছিল।

সব মিলিয়ে, নতুন এই তথ্যপ্রকাশ শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে ফের সামনে এনে দিয়েছে।