আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের বাজেয়াপ্ত করা ডিভাইস থেকে পাওয়া নথিতে উঠে এসেছে ভারতের শিল্পপতি অনিল আম্বানির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগের বিস্তারিত বিবরণ। ২০১৭ থেকে ২০১৯—এই সময়কালে হওয়া ইমেল ও টেক্সট মেসেজে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম, তাঁর কূটনৈতিক সফর এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় একটি রহস্যজনক বৈঠকের ইঙ্গিত রয়েছে।
মার্কিন বিচার দপ্তরের (DoJ) তথাকথিত ‘এপস্টাইন লাইব্রেরি’ থেকে পাওয়া এই নথিগুলি প্রথম প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ড্রপসাইট নিউজ। পরে সেগুলির স্বাধীন যাচাই ও বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ওয়্যার।
নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মে মাসে—যখন ভারতের সাধারণ নির্বাচনের ভোটগণনা চলছে—তখন নিউ ইয়র্কে এপস্টাইনের সঙ্গে একটি বৈঠক নিয়ে সমন্বয় চলছিল অনিল আম্বানির। ১৪ থেকে ২০ মে পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক বার্তা আদান–প্রদান হয় এবং বৈঠকের দিন ঠিক হয় ২৩ মে—যেদিন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের ফল প্রকাশিত হয়।
এপস্টাইনের বার্তা অনুযায়ী, ২৩ মে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে অনিল আম্বানি নিউ ইয়র্কের ইস্ট ৭১তম স্ট্রিটে অবস্থিত এপস্টাইনের ম্যানহাটন টাউনহাউসে পৌঁছন। সেই তথ্য আম্বানির সচিবালয়ের পাঠানো ইমেলেও নথিভুক্ত রয়েছে। সেদিন রাত ৯টা ৫ মিনিটে এপস্টাইন আম্বানিকে একটি বার্তা পাঠান—“today was a treat, nice seeing you।”
কিন্তু এই বৈঠকের আগেই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। ২০ মে, অর্থাৎ বৈঠকের তিন দিন আগে, এপস্টাইন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাক্তন প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লেখেন, “modi sending someone to see me on thurs” — অর্থাৎ বৃহস্পতিবার মোদি তাঁর কাছে কাউকে পাঠাচ্ছেন।
ওই একই দিনে এবং পরে আরও কয়েকটি বার্তায় এপস্টাইন ব্যাননকে জানান যে তিনি “একটি খুবই আকর্ষণীয় মোদি-সংক্রান্ত বৈঠক” করেছেন। তাঁর ভাষায়, মোদির প্রতিনিধি (এপস্টাইনের শব্দে “his guy”) নাকি বলেছেন, ওয়াশিংটনে “কেউ মোদির সঙ্গে কথা বলে না”, এবং মোদির “প্রধান শত্রু চীন এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি পাকিস্তান”।
এপস্টাইনের দাবি অনুযায়ী, ওই প্রতিনিধি আরও বলেছেন যে মোদি “আপনার ভিশন পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন”—যদিও এখানে ‘কার ভিশন’ বা কী ধরনের পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। দ্য ওয়্যার নিশ্চিত করতে পারেনি, সত্যিই মোদি কাউকে পাঠিয়েছিলেন কি না, কিংবা পাঠালে সেই ব্যক্তি অনিল আম্বানি ছিলেন, নাকি অন্য কেউ।
এই কথোপকথনের সময় স্টিভ ব্যানন হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নিয়েছেন প্রায় দুই বছর আগে, কিন্তু মার্কিন দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক মহলে তখনও তিনি চীন-বিরোধী মতাদর্শের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখ। ২৪ মে ভোররাতে ব্যানন এপস্টাইনকে জানান, তিনি ভারতে মোদিকে নিয়ে এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান করছেন এবং তাতে “আমেরিকান হিন্দুদের” যুক্ত করছেন। এর পরপরই এপস্টাইন একাধিক বার্তায় লেখেন “modi on board” এবং ব্যানন ও মোদির মধ্যে যোগাযোগ করানোর প্রস্তাব দেন।
একই দিনে এপস্টাইন অনিল আম্বানিকে লেখেন, “mr modi might enjoy meeting steve bannon, you all share the china problem।” উত্তরে আম্বানি লেখেন, “Sure।” তবে এই বৈঠক আদৌ হয়েছিল কি না, তার কোনও প্রমাণ নথিতে নেই। এপস্টাইন ও আম্বানির সম্পর্ক শুরু হয় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। দুবাই পোর্টস ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের মাধ্যমে দু’জনের পরিচয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আম্বানি এপস্টাইনের কাছে সরাসরি সাহায্য চান।
২ মার্চ ২০১৭-তে আম্বানি লেখেন, “Will need ur guidance on dealing wth white house for india relationship ad defense cooperation।” উত্তরে এপস্টাইনের জবাব ছিল স্পষ্ট: “No ideology needed. tit for tat.” পরবর্তী বার্তাগুলিতে আম্বানি জানান, “Leadership wld like ur help for me to meet jared and bannon asap।” এখানে ‘জ্যারেড’ বলতে ট্রাম্পের জামাই ও হোয়াইট হাউসের সিনিয়র উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারকে বোঝানো হয়েছে। এপস্টাইন তখন নিজেকে ওয়াশিংটনের ‘ইনসাইডার’ হিসেবে তুলে ধরে আম্বানিকে নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম (Signal) ব্যবহারের পরামর্শ দেন এবং ‘inside baseball’—অর্থাৎ গোপন রাজনৈতিক তথ্য—দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
এই সময়কালেই নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফর, ভারত–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং রাফাল যুদ্ধবিমান চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। মোদির আমলে রিলায়েন্স ডিফেন্স রাফাল চুক্তিতে অফসেট পার্টনার হয়, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, বিশেষত প্রাক্তন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের মন্তব্যের পর।
এপস্টাইনের একটি ইমেলে দাবি করা হয়, মোদি ইজরায়েলে গিয়ে “পরামর্শ মেনে গান–নাচ করেছেন” এবং তা নাকি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করার জন্য। এই বক্তব্যকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ৩১ জানুয়ারির বিবৃতিতে “একজন দণ্ডিত অপরাধীর বাজে কল্পনা” বলে খারিজ করেছে।
অনিল আম্বানি ২০০৮ সালে বিশ্বের ষষ্ঠ ধনী ব্যক্তি ছিলেন। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক তদন্ত চলছে। ২০২৪ সালে সেবি তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য শেয়ারবাজার থেকে নিষিদ্ধ করে। ২০২৫–২৬ সালে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট তাঁর বিরুদ্ধে হাজার কোটির বেশি টাকার সম্পত্তি সংযুক্ত করে।
দ্য ওয়্যার অনিল আম্বানি ও তাঁর সংস্থার কাছে এই নথি সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও জবাব মেলেনি। এপস্টাইনের নথিতে ভারতীয় ক্ষমতার শীর্ষস্তরের নাম উঠে আসা নিছক কল্পনা নয়—বরং এমন এক সময়ের রাজনৈতিক–ব্যবসায়িক ছক, যা আজ নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
