আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভোররাতে করা অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে চালানো এই অভিযানে মাদুরো সরকার কার্যত উৎখাত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়েছে রাশিয়ায়, যে দেশটি লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলার অন্যতম প্রধান মিত্র ছিল।
মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে মাদক পাচারসহ একাধিক গুরুতর অপরাধে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসন একে ‘অত্যন্ত সফল ও কার্যকর অপারেশন’ বলে দাবি করলেও, মস্কো এই ঘটনাকে সরাসরি “সশস্ত্র আগ্রাসনের কাজ” বলে নিন্দা করেছে। ক্রেমলিনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী।
কিন্তু কূটনৈতিক ভাষার বাইরে গিয়ে রাশিয়ার ভেতরে যে আতঙ্ক প্রকাশ্যে এসেছে, তা আরও তীব্র। রুশ অনলাইন পরিসরে এবং ক্রেমলিন মহলে আশঙ্কা ছড়িয়েছে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম মারাত্মকভাবে পড়ে যেতে পারে। তাতে শক্তি রপ্তানিনির্ভর রুশ অর্থনীতি গুরুতর ধাক্কা খাবে।
রুশ ধনকুবের ওলেগ দেরিপাস্কা তাঁর টেলিগ্রাম চ্যানেলে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “আমাদের আমেরিকান ‘অংশীদাররা’ যদি ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে পৌঁছে যায়, যেমন তারা ইতিমধ্যেই গায়ানায় পৌঁছেছে, তাহলে তারা বিশ্বের মোট তেল রিজার্ভের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করবে।” দেরিপাস্কার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা হলো রুশ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫০ ডলারের নিচে আটকে রাখা, যাতে রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই আশঙ্কা আরও নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে এক ক্রেমলিনপন্থী সামরিক ব্লগারের মন্তব্যে, যা রাশিয়ার ভেতরে ভাইরাল হয়েছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে “দুঃস্বপ্ন” বলে আখ্যা দিয়ে রুশ নেতৃত্বকেও কার্যত বিশ্বাসঘাতক বলতেও পিছপা হননি। তাঁর ভাষায়, “এটা মোটেও হাসির বিষয় নয়। কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের তেল তোলা অলাভজনক হয়ে যাবে। আমরা অনাহারে মরব। গোটা অর্থনীতির জন্য এটা চেকমেট।” তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তেলের দাম ‘মাটির নিচে’ নামিয়ে পুরো বাজার দখল করে নেবে, আর রাশিয়া পড়ে থাকবে করের বোঝা আর নিজেদের তেল নিয়েই।
এদিকে ট্রাম্প নিজেই স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ভেনেজুয়েলার শাসনভার নিজেদের হাতে রাখবে। তাঁর বক্তব্য, “যতদিন না একটি নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক রূপান্তর সম্ভব হচ্ছে, ততদিন আমরা ভেনেজুয়েলা চালাব। আমরা চাই না এমন কেউ ক্ষমতায় আসুক, যে ভেনেজুয়েলার মানুষের ভালোর কথা ভাববে না।”
এই ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে ভেনেজুয়েলা কি কার্যত মার্কিন তত্ত্বাবধানে চলে যাচ্ছে? আর তার অভিঘাত কতটা গভীর হবে বিশ্ব তেল বাজারে এবং বিশেষ করে রাশিয়ার মতো শক্তি রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির উপর? মাদুরোর পতন শুধু লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রই নয়, বিশ্ব শক্তির ভারসাম্যকেও নতুন করে নাড়িয়ে দিল এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।
