আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যখন পিওকে-র 'জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি' (জেএএসি)-কে একটি সশস্ত্র ও 'নিষিদ্ধ' সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, তখনও বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, রক্তপাত ও কঠোর দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে সংগঠনটি তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার পাক বাহিনী ও পিওকে-র জনগণের মধ্যে সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হওয়ার পর, বুধবার বিকেলে মুজাফফরাবাদে বড় ধরনের প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরে-র শহরগুলো অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। বিবিসি উর্দু জানিয়েছে যে, রাওয়ালাকোট শহরে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দিয়ে কর্তৃপক্ষ সেখানে এক ধরণের অঘোষিত সংবাদ-নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
গত এক মাস ধরে বিক্ষোভে উত্তাল পিওকে বুধবারও চরম উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। রাওয়ালাকোট থেকে পিওকে-র প্রশাসনিক কেন্দ্র মুজাফফরাবাদ পর্যন্ত জেএএসি-র লং মার্চ শুরুর ঠিক আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার, সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন (যার মধ্যে দু'জন নিরাপত্তা কর্মীও রয়েছেন) নিহত হন। বিভিন্ন শহর ও জনপদে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। জেএএসি নেতারা দাবি করেছেন যে, অন্তত ৪০,০০০ বিক্ষোভকারী মুজাফফরাবাদের উদ্দেশ্যে মিছিলে অংশ নেন।
গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে পিওকে-তে। বিবিসি উর্দু জানিয়েছে, প্রতিবাদ মিছিল রুখতে কর্তৃপক্ষ অন্তত ৪,০০০ রেঞ্জার, পুলিশ এবং ফ্রন্টিয়ার কোর সদস্য মোতায়েন করেছে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অবৈধ দখলে যাওয়া এই ভূখণ্ডে চলমান অস্থিরতা পিওকে-তে শাসনব্যবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের তীব্রতাকেই নির্দেশ করছে। বহিরাগতদের জন্য সংরক্ষিত বিধানসভার আসন এবং বৈষম্যের অভিযোগের বিরুদ্ধে জেএএসি-র বিরোধিতার মধ্য দিয়ে এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল। বর্তমানে এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে এক ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে এর জবাব দিয়েছে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ তুলেছে।
বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার পাশাপাশি, গত মাসেই জেএএসি নেতারা অভিযোগ করেছিলেন যে পাকিস্তানের 'হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা' কয়েক সপ্তাহ ধরে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ আটকে রেখেছে। জেএএসি নেতারা ভারতের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন এবং সমর্থকদের কাছে জানতে চেয়েছেন যে, আন্দোলনকারীদের 'লাইন অফ কন্ট্রোল'-এর দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত কি না।
মঙ্গলবার ভারত জানিয়েছে যে, পিওকে-তে চলমান বিক্ষোভ পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সেই "কাঠামোগত শোষণ, মৌলিক অধিকার হরণ এবং প্রশাসনিক নিপীড়ন"-এরই প্রতিফলন, যা তারা ওই অঞ্চলগুলোতে "অবৈধ ও জোরপূর্বক দখলের" মাধ্যমে চালিয়ে আসছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বিক্ষোভকারীদের ওপর পাকিস্তানের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও তুলেছেন এবং "গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপকর্মের" জন্য ইসলামাবাদকে জবাবদিহি করার আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চের কাছে।
পিওকে-তে সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু, ৪ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করেছে পাকিস্তান
বিবিসি উর্দুর তথ্যমতে, মঙ্গলবার তথাকথিত "পুঞ্চ ডিভিশন"-এ দু'টি পৃথক সংঘর্ষে ১০ জন সাধারণ নাগরিক ও দু'জন নিরাপত্তা কর্মীসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। কর্মকর্তারা সম্প্রচারমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন যে, নিহতদের মধ্যে একজন রেঞ্জার্স সদস্য ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন এবং বাকিরা স্থানীয় নাগরিক।
বুধবার (পাকিস্তান সময়) দুপুর দু'টোয় রাওয়ালাকোট থেকে মুজাফফরাবাদ পর্যন্ত জেএএসি-র পূর্বনির্ধারিত লং মার্চ শুরুর ঠিক একদিন আগে এই হিংসার ঘটনাটি ঘটল। বিবিসি উর্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মার্চে "ব্যাপক জনসমাগম হবে" এমন প্রত্যাশায় কর্তৃপক্ষ পুরো পিওকে জুড়ে প্রায় ৪ হাজার রেঞ্জার্স, পুলিশ ও ফ্রন্টিয়ার কোর সদস্য মোতায়েন করেছে।
কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিক্ষোভকারীদের মুজাফফরাবাদের দিকে মার্চ করতে "দেওয়া হবে না"। মুনির-নেতৃত্বাধীন প্রশাসন যখন সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন গুরুত্বপূর্ণ সব পথে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে এই সংঘর্ষগুলোকে "সশস্ত্র জেএএসি কর্মীদের" হামলা হিসেবে অভিহিত করে আসছে। পুলিশের দাবি, "জনসমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়ে" সংগঠনটি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর দোষ চাপানোর লক্ষ্যে নিউ বাস টার্মিনালের কাছে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে।
একইভাবে পাকিস্তানের সংবাদপত্র 'ডন' জানিয়েছে যে, কর্তৃপক্ষ যাকে "পরিষ্কারকরণ অভিযান" (ক্লিয়ারেন্স অপারেশন) হিসেবে বর্ণনা করেছে, সেই ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দু'জন সদস্য "শহিদ" হয়েছেন এবং "নিষিদ্ধ জেএএসি"-র সাতজন কর্মী নিহত হয়েছেন।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান জেএএসি-র, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টার অভিযোগ
জেএএসি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। 'এক্স'-এ তাদের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে রেঞ্জার্স সদস্যের মৃত্যুর দায় অস্বীকার করা হয়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সশস্ত্র ব্যক্তিদের ভিডিওর জবাবে কমিটি বলেছে, "এরা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।" তারা আরও বলে, "আমরা যদি বন্দুক তুলে নেওয়ার উদ্দেশ্যই রাখতাম, তবে আজ পর্যন্ত আমাদের এতজন নিরস্ত্র ভাইয়ের লাশ বহন করতে হতো না।"
আরেকটি পোস্টে জেএএসি জানায়, "নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন স্থানে অসামরিক পোশাকে তাদের সশস্ত্র সদস্যদের মোতায়েন করেছে এবং তাদের দিয়ে গুলি চালিয়ে এমন ধারণা তৈরির চেষ্টা করছে যে এরা অ্যাকশন কমিটির লোক। অ্যাকশন কমিটি জনগণের সংগঠন এবং জনগণ শান্তিপূর্ণ, তাদের কাছে কোনও অস্ত্র নেই। মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। জনগণের সতর্ক থাকা উচিত এবং যারা গুলি চালাচ্ছে, বিশেষ করে তারা যদি সাধারণ পোশাকে থাকে, তাদের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। অ্যাকশন কমিটির সদস্যরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ।" এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জেএএসি একথা জানিয়েছে।
পিওকে-তে আয়োজিত এই 'লং মার্চ' কী বিষয়ে?
পিওকে-তে পাকিস্তান সরকারের বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে জেএএসি-র বৃহত্তর আন্দোলনেরই একটি অংশ হল এই লং মার্চ। তাদের এর দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা বাতিল করা, রাজনৈতিক নিয়োগ কমানো, "পাকিস্তানে বসবাসরত কাশ্মীরি শরণার্থীদের" জন্য সংরক্ষিত বিধানসভার আসন বিলুপ্ত করা, জেএএসি কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, রেঞ্জার্স মোতায়েনের বিরোধিতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, মাংলা বাঁধের ক্ষতিপূরণ প্রদান, প্রশাসনিক সংস্কার এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা।
কমিটির তরফে ছাত্র সংসদের নির্বাচন, বিচার বিভাগীয় সংস্কার, কর ছাড়, উন্নত জনসেবা এবং মাসিক ন্যূনতম ৫০,০০০ পাকিস্তানি রুপি বেতনের দাবিও জানানো হয়েছে।
বিক্ষোভ যখন তীব্রতর হচ্ছিল, তখন জেএএসি নেতারা অভিযোগ করেন যে পাকিস্তানের 'হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা' কয়েক সপ্তাহ ধরে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রেখেছে, যার ফলে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং জনরোষ আরও বেড়েছে। আন্দোলনের নেতা সরদার আমান খান ভারতের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানান এবং সমর্থকদের কাছে জানতে চান যে আন্দোলনকারীদের 'লাইন অফ কন্ট্রোল'-এর দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত কি না।
















