আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেনেজুয়েলার বিতর্কিত ও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে ভারতের এক অপ্রত্যাশিত আধ্যাত্মিক সংযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক সংকট ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অনেক আগেই মাদুরো ভারতের সঙ্গে এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ভারতীয় ধর্মগুরু সত্য সাই বাবা।
ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম নেওয়া মাদুরো তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের মাধ্যমে সত্য সাই বাবার ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হন। বিয়ের আগেই ফ্লোরেস তাঁকে এই আধ্যাত্মিক পথের সঙ্গে যুক্ত করেন। ২০০৫ সালে মাদুরো ও ফ্লোরেস একসঙ্গে অন্ধ্রপ্রদেশের পুট্টাপার্থীর প্রসান্তি নিলয়ম আশ্রমে গিয়ে সত্য সাই বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সময়কার একটি ছবিতে দেখা যায়, তরুণ মাদুরো ও ফ্লোরেস মেঝেতে বসে গুরুর পাশে রয়েছেন একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাতের মুহূর্তে।
পরবর্তীকালে মাদুরোর রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এই আধ্যাত্মিক প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদের তাঁর ব্যক্তিগত দপ্তরে সিমন বলিভার ও হুগো চাভেজের প্রতিকৃতির পাশাপাশি সত্য সাই বাবার একটি ছবি টাঙানো ছিল।
২০১১ সালে সত্য সাই বাবার মৃত্যু হলে, সে সময় ভেনেজুয়েলার বিদেশমন্ত্রী থাকা মাদুরো জাতীয় সংসদে সরকারি শোকপ্রস্তাব আনার উদ্যোগ নেন। তাঁর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি একটি আনুষ্ঠানিক শোকপ্রস্তাব পাশ করে এবং গুরুর “মানবতার প্রতি আধ্যাত্মিক অবদান”-এর স্বীকৃতিস্বরূপ একদিনের জাতীয় শোক পালন করে।
মাদুরোর শাসনকালে, যখন বহু বিদেশি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ভেনেজুয়েলা থেকে বহিষ্কৃত হয়, তখনও সত্য সাই সংগঠন দেশটিতে নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যায়। লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা অন্যতম বৃহৎ সাই ভক্ত সম্প্রদায়ের ঠিকানা, যার শিকড় ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলার জাতীয় দিবস উদ্যাপনের সরকারি আমন্ত্রণপত্রে ‘ওঁ’ প্রতীকের ব্যবহার আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল সৃষ্টি করে। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক মাস আগে, মাদুরো সত্য সাই বাবার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে সরে এসে এক আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। তিনি গুরুকে “আলোর এক সত্তা” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন,
“আমি সবসময় আমাদের সাক্ষাতের কথা স্মরণ করি… এই মহান শিক্ষকের প্রজ্ঞা আমাদের পথ আলোকিত করুক।”
Recently, the Venezuelan government sent out invitations for its National Day Celebrations featuring a 🕉️, leaving many puzzled.
— Arun Pudur (@arunpudur)
Few know that Venezuelan President Nicolás Maduro has been a Satya Sai Baba devotee for decades. Unfortunately, many Hindus are unaware of this and… pic.twitter.com/nwIv9Nv3U4Tweet by @arunpudur
১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর এক শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম নেওয়া মাদুরো ছিলেন এক ট্রেড ইউনিয়ন নেতার সন্তান। যুবক বয়সে তিনি বাসচালকের কাজ করতেন। ১৯৯২ সালে সেনা কর্মকর্তা হুগো চাভেজের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় মাদুরো তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেন এবং সেই সময়েই চাভেজের বামপন্থী রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সমর্থকে পরিণত হন যে সময় বিশ্ব রাজনীতিতে সমাজতন্ত্র ছিল প্রবলভাবে বিতর্কিত।
১৯৯৮ সালে চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর মাদুরো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বিরোধী বলিভারীয় বিপ্লবের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিরোধীরা তাঁর শ্রমজীবী পটভূমিকে কটাক্ষ করে তাঁকে চাভেজের অনুগত হিসেবে তুলে ধরলেও, তাঁর রাজনৈতিক উত্থান থেমে থাকেনি। তিনি জাতীয় সংসদের সভাপতি এবং পরে বিদেশমন্ত্রী হন। এই ভূমিকায় তিনি তেলভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে তুলতে বিশ্বজুড়ে সফর করেন।
২০১৩ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চাভেজের মৃত্যুর পর অল্প ব্যবধানে মাদুরো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে তাঁর জনপ্রিয়তা কখনওই চাভেজের ক্যারিশমার কাছাকাছি পৌঁছায়নি। শাসনকালের শুরু থেকেই ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ খাদ্যসংকট, পণ্যের ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়ে। তেলের দাম পতনের পরও চাভেজ যুগের ভর্তুকি ব্যবস্থা বজায় রাখায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
২০১৩ সালে মূল্যস্ফীতি বাড়লে মাদুরো সেনা নামিয়ে গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রির দোকান দখল করেন এবং জোর করে কম দামে পণ্য বিক্রি করান যা স্বল্পমেয়াদে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে। ২০১৮ সালে কারাকাসে এক সমাবেশে বক্তৃতার সময় বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলার চেষ্টা হলে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়াকড়ি করা হয় এবং প্রকাশ্য উপস্থিতি সীমিত হয়ে যায়।
পুরো রাজনৈতিক জীবনে মাদুরোর পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সংসদের শীর্ষ নেতৃত্বসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন এবং অনেক সময়ই প্রেসিডেন্টের সমান প্রভাবশালী শক্তিকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার দাবি করেন, নিকোলাস মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে ভেনেজুয়েলার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকার অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের পাশাপাশি, এক অদ্ভুত ভারত-ভেনেজুয়েলা আধ্যাত্মিক যোগসূত্রও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
