আজকাল ওয়েবডেস্ক: যুদ্ধবিরতি চলছে। তার মধ্যেই তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এই যুদ্ধবিরতি শর্তসাপেক্ষ। আরও জানানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলকে যুদ্ধের পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ফলে যুদ্ধবিরতির সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে ইরান। ইসলামাবাদে আলোচনার আগে রুশ সংবাদ সংস্থা 'তাস'-কে এমনটাই জানিয়েছেন ইরানের এক শীর্ষ  সূত্র। 

তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিটি জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেই ইরানের অনুমোদন এবং একটি নির্দিষ্ট প্রোটোকল বা নিয়মাবলী মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

ইরানের শীর্ষ সূত্র জানাচ্ছে, 'বর্তমান যুদ্ধবিরতির আওতায়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন ১৫টির কম জাহাজ চলাচলের অনুমতি রয়েছে। এই চলাচল কঠোরভাবে ইরানের অনুমোদন এবং একটি নির্দিষ্ট প্রোটোকল বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। আইআরজিসি-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোটির বিষয়ে আঞ্চলিক পক্ষগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। যুদ্ধের পূর্ববর্তী স্থিতাবস্থায় আর ফিরে যাওয়া হবে না।'

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী মাত্র ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত এই নৌপথটি পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে যাওয়ার প্রধান পথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং সারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান এই প্রণালিটি বেশির ভাগ সময় বন্ধ রেখেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে।

ইরান এই যুদ্ধবিরতির সঙ্গে একটি আর্থিক শর্তও জুড়ে দিয়েছে। তেহরানের দাবি, দুই সপ্তাহের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই বিদেশে আটকে থাকা তাদের সম্পদগুলো অবশ্যই মুক্ত বা 'আনফ্রিজ' করতে হবে। সূত্রটি 'তাস'-কে জানিয়েছে, "ইরানের আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী নিশ্চয়তা, যা এই দুই সপ্তাহের সময়সীমার মধ্যেই অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।" 

তেহরান এও জোর দিয়ে বলছে যে, যুদ্ধের সমাপ্তি অবশ্যই রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে এবং তাদের দেওয়া শর্তাবলী অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেতে হবে। আর যদি তা না হয়, তবে তার পরিণাম সম্পর্কেও তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে।

সূত্রটি জানিয়েছে, "যদি যুদ্ধের সমাপ্তি আমাদের নির্ধারিত শর্তাবলীর ভিত্তিতে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোনও প্রস্তাবে লিপিবদ্ধ বা বিধিবদ্ধ না হয়, তবে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সন্ত্রাসবাদী শাসনের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত, ঠিক যেভাবে গত ৪০ দিন ধরে আমরা যুদ্ধ চালিয়েছি, এবং এবার আরও বেশি তীব্রতার সঙ্গে।" 

ইরান আরও দাবি করেছে যে, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়ে ওয়াশিংটন যেন এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি না করে। সূত্রটি জানিয়েছে, "ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে বলতে গেলে - আমরা আদান-প্রদানকৃত চুক্তির লিখিত শর্তাবলীর প্রতি কঠোরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমরা সক্রিয়ভাবে তা মেনে চলছি।"  

নিজের বেঁধে দেওয়া এবং 'সভ্যতা-ধ্বংসকারী' হিসেবে বর্ণিত চরমসীমা বা ডেডলাইনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, গত ৭ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি ইরানের ১০-দফা প্রস্তাবকে আলোচনার জন্য একটি "কার্যকর ভিত্তি" হিসেবে অভিহিত করেন এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করেন। আগামী ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি লেবানন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই চাপের মুখে পড়েছে। ইরান জোর দিয়ে বলেছে যে, যেকোনও চুক্তিতে অবশ্যই লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল তাদের অবস্থানে অটল থেকে দাবি করছে যে, লেবানন কখনওই এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ ছিল না। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই ইজরায়েল লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।

তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, ইজরায়েল যদি লেবাননে তাদের হামলা বন্ধ না করে, তবে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। ইজরায়েলি হামলার অজুহাত দেখিয়ে ইরানও ইজরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।