আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেনেজুয়েলার 'প্রাক্তন' প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত ফেডারাল জেল  মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার (MDC Brooklyn)–এ রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর অভিযানে কারাকাসে গ্রেপ্তারের পর তাঁদের এই কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। মাদুরোর বিরুদ্ধে নার্কো-সন্ত্রাসবাদ, কোকেন পাচার ও অস্ত্র ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতে দোষ অস্বীকার করে তাঁরা বর্তমানে বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন।

এই কারাগারটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পরিচিত এক ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের প্রতীক হিসেবে। আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন এবং এমনকি ফেডারাল বিচারকরাও একে দীর্ঘদিন ধরে ‘অমানবিক’ ও ‘নরকসম’ বলে বর্ণনা করে আসছেন। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে ২০২৪ সালে নিউ ইয়র্কের অন্তত দু’জন ফেডারাল বিচারক প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, এই জেলে বন্দি পাঠানো মানে কার্যত শাস্তির আগেই কাউকে চরম দুর্ভোগে ঠেলে দেওয়া।

২০১৯ সালে শীতের তীব্র ঠান্ডার মধ্যে জেলটিতে টানা এক সপ্তাহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। হিটিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বন্দিদের বরফশীতল অন্ধকার সেলে আটকে থাকতে হয়। শৌচালয় অচল, খাবার অস্বাস্থ্যকর  এবং চিকিৎসা প্রায় নেই বললেই চলে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ স্বীকার করে যে জেলের হিটিং সমস্যা বহু বছর ধরেই চলছে। সেই ঘটনায় প্রায় ১,৬০০ বন্দিকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকার বাধ্য হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং আরও অবনতি ঘটে। ২০২৪ সালে একাধিক বন্দিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। একজন বন্দিকে ৪৪ বার ছুরিকাঘাতের অভিযোগ ওঠে, আরেকজনকে পিঠে আইস-পিক গাঁথা অবস্থায় হাসপাতালে পাঠাতে হয়। এসব ঘটনায় জেলের ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কারাগারটিতে দীর্ঘদিন ধরেই চরম কর্মী সংকট চলছে। চিকিৎসক ও নার্সের অভাব, নোংরা ও দূষিত খাবার, শ্যাওলা ও ছত্রাকে ভরা দেয়াল,এসব অভিযোগ নিয়মিত উঠে আসে। বহু আইনজীবী জানিয়েছেন, বন্দিদের চিকিৎসা পেতে বারবার লিখিত আবেদন করতে হয়, তাও অনেক সময় কোনও  সাড়া মেলে না। স্পেশাল হাউজিং ইউনিটে রাখা বন্দিদের দিনে প্রায় ২৩ ঘণ্টা সেলের ভেতর বন্দি করে রাখা হয়, যা কার্যত দীর্ঘমেয়াদি একাকী কারাবাস।

কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদের বিশাল ও আলো ঝলমল পরিবেশ থেকে ব্রুকলিনের এই অন্ধকার, হিংসাত্মক ও অবহেলিত  এক জেলে  নিকোলাস মাদুরোর স্থানান্তর  কার্যত শুধু একজন শাসকের পতনের ছবি নয়। এটি একই সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারাল কারাগার ব্যবস্থার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার সংকটের এক নগ্ন দলিল, যেখানে বন্দিদের পাঠাতে বিচারকরাও ভয় পান।