আজকাল ওয়েবডেস্ক: আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে যখনই সংঘাত বা উত্তেজনার পারদ চড়েছে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামজুড়ে বড় বড় নামগুলোই বারবার সামনে এসেছে। কিন্তু এই তীব্র ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের নেপথ্যে এমন একজন মানুষ নিঃশব্দে কলকাঠি নাড়ছেন, যাকে নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল অনেক বেশি। প্রথাগত কোনও  কূটনৈতিক ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা তাঁর নেই, অথচ মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই এখন অন্যতম প্রধান কারিগর। তিনি আর কেউ নন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা এবং ইভাঙ্কার স্বামী জ্যারেড কুশনার।

কুশনারের জীবনের গল্পটা সাধারণ কোনও  রাজনীতিকের মতো নয়। তাঁর ক্ষমতার উৎস যেমন পারিবারিক, তেমনই তাঁর কূটনৈতিক চালের নেপথ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থের এক জটিল জাল। কুশনারের বাবা চার্লস কুশনার ছিলেন আমেরিকার এক অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং বিত্তশালী ব্যবসায়ী, যিনি ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নেতানিয়াহু যখনই আমেরিকায় যেতেন, কোনও  হোটেলে না উঠে কুশনারদের বাড়িতেই থাকতেন। ফলে খুব ছোটবেলা থেকেই নেতানিয়াহুর ছত্রছায়ায় বড় হয়েছেন জ্যারেড, খুব কাছ থেকে দেখেছেন ইজ়রায়েলি রাজনীতিকে। ধনী বাবার দৌলতে হার্ভার্ডে পড়া কুশনারের সখ্য ছিল ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান— দুই শিবিরেই।

পড়াশোনা শেষ করে শ্বশুরের মতোই রিয়্যাল এস্টেট ব্যবসায় নামেন কুশনার। তবে শুধু তাতেই আটকে না থেকে সংবাদমাধ্যম এবং ডিজিটাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। ২০০৯ সালে ইভাঙ্কাকে বিয়ে করার পর ট্রাম্প পরিবারের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পেছনে কুশনারের ভূমিকা ছিল এক মস্ত বড় বিস্ময়। প্রথাগত প্রচারের বাইরে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ডেটা হাব তৈরি করেছিলেন তিনি। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সমাজমাধ্যমকে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে ট্রাম্পের একেকটি বার্তা ঠিক কোন ভোটারের কাছে পৌঁছানো দরকার, তা নির্ধারণ করতেন কুশনার। কম খরচে নিখুঁত প্রচারের এই কৌশলেই ট্রাম্প সেবার হোয়াইট হাউসের চাবিকাঠি হাতে পান।

ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার পর জামাতাকে নিজের মুখ্য উপদেষ্টা করেন এবং কোনও  পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাঁকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির দূত হিসেবে পাঠান। অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদদের চমকে দিয়ে ২০২০ সালে কুশনারের মধ্যস্থতাতেই স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম চুক্তি’। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইজ়রায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই চুক্তিটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ঘটনা। তবে এই পুরো শান্তি পরিকল্পনার অন্তরালে কুশনারের কৌশল ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট— ইরানকে সম্পূর্ণ একঘরে করে বাকি আরব বিশ্বের সঙ্গে ইজ়রায়েলের সম্পর্ক মজবুত করা।

২০২০ সালে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর কুশনার পুরোপুরি ব্যবসায় ফিরে যান এবং ‘অ্যাফিনিটি পার্টনার্স’ নামে একটি ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম খোলেন। কিন্তু এখানেই তাঁর ক্ষমতার জাদু শেষ হয়নি। মাত্র ছ’মাসের মধ্যে তিনি সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমনের সার্বভৌম তহবিল থেকে ২০০ কোটি ডলারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেন। এই অর্থ তিনি বিনিয়োগ করেন ইজ়রায়েলের বাজারে। যে দুই অঞ্চল দশকের পর দশক ধরে একে অপরের প্রতিপক্ষ ছিল, কুশনার নিজের সংস্থার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিকভাবে জুড়ে দেন। আর এই বিশাল অর্থপ্রবাহ থেকেও ইরানকে পুরোপুরি বাদ রাখা হয়।

২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কুশনার আবার পর্দার আড়াল থেকে মূল রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে যখনই ইরান ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে, ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনায় আমেরিকার পক্ষে হাল ধরেছেন কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ হুইটকফ। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, কুশনারের এই ভূমিকায় ইরান তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। পারস্যের প্রতিনিধিরা ট্রাম্পের জামাতার সঙ্গে কথা বলতেই রাজি ছিলেন না, কারণ কুশনার স্পষ্টভাবেই আলোচনার টেবিলে ইজ়রায়েলের স্বার্থ এবং নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। ইরান চেয়েছিল আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের সঙ্গে কথা বলতে, কিন্তু ট্রাম্প সেই সুযোগ দেননি।

অভিযোগ উঠছে, কুশনার ও হুইটকফের এই অনমনীয় মনোভাব এবং প্ররোচনার কারণেই শেষ পর্যন্ত কূটনীতির পথ বন্ধ হয়ে আমেরিকা সরাসরি ইরানের ওপর বিমান হামলা চালানোর মতো চরম সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও ভান্সের পাশাপাশি কুশনারকেই ইসলামাবাদে পাঠানো হয়েছিল আলোচনার জন্য। কোনও  সরকারি পদ বা কূটনৈতিক সাফল্য না থাকা সত্ত্বেও কেবল ‘প্রেসিডেন্টের জামাতা’ পরিচয়ে ভ্লাদিমির পুতিন, জেলেনস্কি বা নেতানিয়াহুর মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে কুশনারের এই ওঠাবসা মার্কিন প্রশাসনকে তীব্র সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ইজ়রায়েলকে সুরক্ষিত করতে কুশনার আমেরিকাকে একটি বিপজ্জনক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। একাধারে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রের শীর্ষতম গোপন কূটনৈতিক দূতের এই দ্বৈত ভূমিকা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির এক অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।