আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের 'পুশ-ইন' (জোর করে ফেরৎ পাঠানো) এবং সীমান্তের কাছে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার প্রতিবাদে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিক্ষোভের ঘোষণা করা হয়েছে। শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জামায়াত এই বিক্ষোভ কর্মসূচির কথা জানিয়েছে।

জামাত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট জানিয়েছে যে, তারা শুক্রবার (১২ জুন) বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে। এরপর ১৫ জুন ঢাকায় সমাবেশ ও মিছিল করবে। জোটটি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেছে এবং ভারত  করে মানুষকে সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছে। এছাড়া জামায়াত জোট অভিযোগ করেছে যে, "ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকরা নিহত হয়েছেন।"

'পুশ-ইন' বিষয়টি বাংলাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ঠিক এই সময়েই ভারতীয় সীমান্ত চৌকি অভিমুখে জামায়াতের  মিছিলের ঘোষণা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়াদিল্লিতে ভারতের বিএসএফ এবং বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠকের আগেই ঢাকা এই বিষয়টি উত্থাপন করেছিল।

তবে ভারত বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা কোনও 'পুশ-ইন' (জোর করে অনুপ্রবেশ) কার্যক্রম চালাচ্ছে না। বরং সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমেই কেবল অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরৎ পাঠাচ্ছে। নয়াদিল্লির মতে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ও বিদ্যমান নিয়মকানুন মেনেই কেবল অবৈধ অভিবাসীদের ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচির ফলে বিষয়টি কেবল সরকারি কূটনৈতিক আলোচনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজপথেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

প্রাক্তন সংসদ সদস্য এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জামায়াত জানিয়েছে, "১১-দলীয় জোট ১২ জুন সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে এবং এরপর ১৫ জুন ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করবে।"

ঢাকা-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'দ্য ডেইলি সান'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুর দিকে আজাদ সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের মন্তব্যের সঙ্গে "ভারতীয় মন্ত্রীদের" মন্তব্যের তুলনা করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সরকার ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় অথবা ভারতের সঙ্গে একাট্টা অবস্থান নিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে বিজেপির বিপুল জয়ের পর এবং অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ফেরৎ পাঠানোর বিষয়ে ভারতের নতুন করে তৎপরতা শুরুর প্রেক্ষাপটে, গত মে মাসে ঢাকা তার আন্তর্জাতিক সীমান্তে সতর্ক অবস্থা জোরদার করেছিল।

বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের আগে এই ১১-দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। জোটটির নেতৃত্বে রয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।  এতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী আরও কয়েকটি দল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টি।

ভারত সীমান্তে জামায়াতের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা
বুধবার ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদিক বৈঠকে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

১১-দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ জানান, শুক্রবার (১২ জুন) সব সীমান্তবর্তী জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে সমাবেশ আয়োজন করা হবে। এরপর ১৫ জুন রাজধানীতে বড় আকারের বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

জামায়াত ছাড়াও তাদের এই ইসলামপন্থী জোটে রয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি এবং অন্যান্য বিরোধী দল। বুধবার আজাদ জানান, জোটটি তাদের প্রচারণার অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় সেমিনার এবং ঢাকায় একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে।

হাসিনা-বিরোধী এনসিপি-র ‘পুশ-ইন’ বা জোর করে অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে ‘মানব ঢাল’ তৈরির আহ্বান
একই সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি-র প্রধান সমন্বয়কারী নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি বলেন, “সীমান্তের ‘জিরো লাইন’ বা শূন্যরেখার কাছাকাছি বসবাসকারী বাসিন্দারা এক মানবিক সংকটের মুখোমুখি।” তিনি বলেন, ‘পুশ-ইন’ বা জোর করে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি-কে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি ‘মানব ঢাল’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে “সন্ত্রাসবাদী, চোরাকারবারি বা অপরাধীরা” বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে জামায়াতের আজাদ দাবি করেন যে, গত তিন মাসে সীমান্তে ৫০টিরও বেশি ‘পুশ-ইন’-এর ঘটনা ঘটেছে।

আজাদের মতে- মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ২,৪৭৯ জন মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

জামায়াত নেতা আরও অভিযোগ করেন যে, বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে বিএসএফ-এর গুলিতে ১৯ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন আহত হয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, বিএসএফ এবং মিয়ানমারের আরাকান আর্মি ৮৩ জনকে আটক করেছে বা জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছে।

‘পুশ-ইন’ সংক্রান্ত বাংলাদেশের দাবির বিষয়ে ভারত কী বলেছে?
বাংলাদেশ যাকে ‘পুশ-ইন’ বলে অভিহিত করছে, সেই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই জামায়াত জোটের এই ঘোষণা এল। ঢাকা জানিয়েছে, ৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছিল।

ভারত বরাবরই এই ঘটনাগুলোকে ‘পুশ-ইন’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

নয়াদিল্লির অবস্থান হল, যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং সেই ভারতের- বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ভারত আশা করে বাংলাদেশ জাতীয়তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে, যাতে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে।

ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হল, “ভারতে অবস্থানরত সকল অবৈধ বিদেশি নাগরিককে আমাদের আইন, প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা অনুযায়ী নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে।” পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের মতো রাজ্যগুলোতে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার মধ্যেই এই ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার জানিয়েছে যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪,৮০০ অবৈধ অভিবাসীকে বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানো হয়েছে এবং আরও ৮৩৬ জন ফেরৎ যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। কোনও দেশের সঙ্গে ভারতের এটিই দীর্ঘতম সীমান্ত। একদিকে যখন জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ভারত সীমান্তে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন অন্যদিকে নয়াদিল্লিতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক ও সীমান্ত-ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলা সত্ত্বেও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট এই ইস্যুটিকে রাজপথে নিয়ে আসার পথ বেছে নিয়েছে।