আজকাল ওয়েবডেস্ক: শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আদায়ের মধ্য দিয়ে ভারতে 'ককরোচ জনতা পার্টি'র নেতৃত্বাধীন তরুণদের আন্দোলন শেষ হয়েছে। এই আন্দোলন-বিক্ষোভের মাধ্যমে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সেই দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হল, যেখানে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তবে একটি প্রতিবেশী দেশ এর ব্যতিক্রম- তা হল পাকিস্তান।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের প্রতিবেশী দেশ- শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালে ব্যাপক ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান দেখা গিয়েছে। যা ক্ষমতাসীন সরকারকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। অথচ পাকিস্তান এখন পর্যন্ত এই ধারার বাইরেই। এখন প্রশ্ন কেন?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে, পাকিস্তানে তরুণদের গণঅভ্যুত্থান ঘটার মতো সব উপাদানই রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি এক সঙ্কট থেকে আরেক সঙ্কটের মুখোমুখি। শরিফের দেশ বারবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি এমন দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম। পাশাপাশি দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনী- রাজনীতি ও সুশীল সমাজের বড় অংশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
এমন পরিস্থিতি সত্ত্বেও, পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সেই ধরনের তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকে দূরেই রয়েছে। বিদেশনীতি বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান 'এক্স'-পোস্টে জানিয়েছেন, 'শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল এবং এখন ভারতে আমরা পরিবর্তনের দাবিতে তরুণদের যে গণ-আন্দোলন দেখেছি, পাকিস্তানে কেন তেমনটা ঘটছে না? এটি একটি যুক্তিগ্রাহ্য প্রশ্ন, কারণ এই আন্দোলনগুলোর পেছনে যেসব কারণ (যেমন- দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, বেকারত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ) নিহিত তা পাকিস্তানেও রয়েছে।'
এর অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানের তরুণরা রাজনীতিতে উদাসীন। বরং বিষয়টি উল্টো। ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ ও ব়্যাফ-এর দমন-পীড়নের পর দিল্লি ও ভারতজুড়ে যখন বিক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখন অনেক পাকিস্তানি তরুণ সোশ্যাল মিডিয়ায় তার প্রশংসা করে সেদেশেও একই ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে নিজেদের অক্ষমতার জন্য আক্ষেপ করছিলেন।
বিবিসি উর্দুর প্রতিবেদনে এক পাকিস্তানি তরুণের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। তিনি দাবি করেন, "আমরা যদি কখনও সুযোগ পাই, তবে আমাদেরও এভাবেই রাস্তায় নামা উচিত। ককরোচ জনতা পার্টি... তারা সত্যিই দারুণ। তারা অতিরিক্ত তাত্ত্বিক নয়, আর এই বিষয়টিই আমার ভাল লাগে।"
তা সত্ত্বেও, খোদ পাকিস্তানের ভেতরেই তরুণদের সংগঠিত প্রতিবাদ বা ভিন্নমত প্রকাশের বিষয়টি অনেকাংশেই স্তিমিত রয়ে গিয়েছে।
অবশ্য নিপীড়নের মুখে প্রতিরোধের ইতিহাস পাকিস্তানের রয়েছে। যেমন, জিয়া-উল-হকের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিচার বিভাগের ওপর পারভেজ মোশাররফের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে আইনজীবীদের আন্দোলন এবং অতি সম্প্রতি বালুচিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের কর্মীদের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচি।
বিশ্লেষকরা এর নেপথ্যে বেশ কিছু কারণকে দায়ী করেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পাকিস্তানে ছাত্র রাজনীতির আপেক্ষিক দুর্বলতা, ক্যাম্পাসে তরুণদের সক্রিয়তার ওপর দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন এবং বর্তমান আন্দোলনগুলোর একটি বিস্তৃত ও ঐক্যবদ্ধ মোর্চায় রূপ নিতে ব্যর্থ হওয়া।
পাকিস্তানের দুর্বল ছাত্র রাজনীতি
দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় পাকিস্তানে শক্তিশালী ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যের অভাব রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সঙ্গে এর পার্থক্য স্পষ্ট। ওই দেশগুলোতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী ছাত্র ও যুব সংগঠন রয়েছে, যারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনমত গঠন ও সংগঠিত করার কাজ করে এবং সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ-নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, এর নেপথ্যে জেনারেল জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসনের উত্তরাধিকার বা প্রভাব রয়েছে, যা ছাত্র রাজনীতিকে কঠোরভাবে দমন করেছিল। তিনি 'এক্স'-এ লিখেছেন, 'জেনারেল জিয়া ১৯৮০-র দশকে ছাত্র সংসদ বা ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আর পুনর্বহাল করা হয়নি। পাকিস্তানের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কথা বিবেচনা করলে, সেই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বা উত্তরাধিকারকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।'
উল্লেখ্য যে, এই নিষেধাজ্ঞার আগে পাকিস্তানে ছাত্র রাজনীতি বেশ প্রাণবন্ত ছিল। ১৯৬৮-৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র সংগঠনগুলো সামনের সারিতে ছিল। মাসব্যাপী দেশজুড়ে চলা সেই আন্দোলনের ফলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে জিয়ার আমলে ছাত্র ইউনিয়নগুলোর ওপর দমনপীড়ন একটি সন্ধিক্ষণ ছিল। যা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ক্যাম্পাসের গুরুত্ব ও সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
এরপর থেকে পাকিস্তানে তরুণ-নেতৃত্বাধীন খুব কমই কোনও দেশব্যাপী আন্দোলন দেখা গিয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হল ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর আয়োজিত 'স্টুডেন্টস সলিডারিটি মার্চ', যেখানে ছাত্র ইউনিয়ন পুনর্বহাল এবং শিক্ষার্থীদের অধিকতর অধিকারের দাবি জানানো হয়েছিল। কর্মীদের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও ছাত্র ইউনিয়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা মূলত বহালই রয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে তরুণদের আন্দোলনকে যে ধরনের সংগঠিত ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক শক্তি জুগিয়েছে, পাকিস্তানে তার অভাব রয়ে গিয়েছে।
পাকিস্তানে বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ আন্দোলন পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো প্রতিবাদ আন্দোলনের কোনও অভাব নেই। বালুচিস্তানে কর্মীরা বৃহত্তর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ করার ঘটনা বন্ধ এবং প্রদেশের বিশাল খনিজ সম্পদের ন্যায্য হিস্যার দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভ চালিয়ে আসছেন। যদিও তাদের এই আন্দোলনগুলো প্রায়শই দীর্ঘদিনের বালুচ বিদ্রোহের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে।
একইভাবে, পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরেও ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’র নেতৃত্বে অস্থিরতার ঢেউ দেখা গিয়েছে। তারা বিদ্যুৎ-এর আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে আইনসভায় শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষণের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষোভ সংগঠিত করেছে।
তবে মূল পার্থক্য হল, এই আন্দোলনগুলো মূলত তাদের নিজ নিজ অঞ্চল ও নির্দিষ্ট দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে যে ধরনের গণ-অভ্যুত্থান দেখা গিয়েছে, তার পাল্টা পাকিস্তানের এই আন্দোলনগুলো দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়নি যা ইসলামাবাদকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
পাকিস্তানের অনেক তরুণও একই মত পোষণ করেন। বিবিসি উর্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক পাক তরুণ বলেন, ভারতে সিজেপি -র নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হল একটি সাধারণ লক্ষ্যের পেছনে আন্দোলনকারীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা। ওই শিক্ষার্থী বলেন, "তাদের ঐক্যের বিষয়টিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পাকিস্তানে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ আমরা পাঞ্জাবি ও পশতুন, সুন্নি ও শিয়া- এভাবে বিভক্ত। আমার মনে হয় না পাকিস্তানের ‘জেন জি’ বা বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা এভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে।"
এর বিপরীতে সিজেপি-র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। ‘নিট-ইউজি’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভটি শীঘ্রই আরও নানা দাবির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ‘মহিলা সংরক্ষণ আইন’ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনকারী, ভারতের ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়নের বিরোধিতাকারী এবং আরও কয়েকটি গোষ্ঠী একই আন্দোলনের ব্যানারে একত্রিত হয়। ফলে এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ইস্যু-ভিত্তিক আন্দোলন থেকে জন-অসন্তোষের এক ব্যাপক বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়।
পাকিস্তানের শিক্ষার্থী, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং এমনকি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তেও সিজেপি-র নেতৃত্বাধীন ‘জেন -জি’-এর আন্দোলনের প্রশংসা করা হয়েছে। এই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তবুও, তরুণদের সংগঠিত করতে সক্ষম শক্তিশালী সংগঠনের অভাব এবং বিদ্যমান প্রতিবাদ আন্দোলনগুলোর একটি ঐক্যবদ্ধ মোর্চায় মিলিত হতে না পারাই, পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের পক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর সম্ভাবনা কম বলেই মনে হয়।
















