আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনীতি, সুশীল সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে মৌলবাদের কালো ছায়া দীর্ঘদিনের। কিন্তু এবার সেই ধর্মীয় কট্টরপন্থার আঁচ গিয়ে লেগেছে খোদ দেশের সেনাবাহিনীর গায়েও। যে সেনা দল এতদিন নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করত, তাদের অন্দরে এখন বইছে ভোলবদলের হাওয়া। সম্প্রতি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সামরিক জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা মেনে চলার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ইসলামের প্রথম চার খলিফা—উমর, আবু বকর, আলী ও উসমানের নামে চারটি কোম্পানি নিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও সেনার এই আকস্মিক ভোলবদল নিয়ে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে।
অথচ এক বছর আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছরের আগস্ট মাসে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তুলে ধরে বলেছিলেন যে বাংলাদেশ সবার, এখানে ধর্ম বা জাতিগত কোনও ভেদাভেদ থাকবে না এবং তিনি হিন্দুদের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক এক বছরের মাথায়, সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজের অনুষ্ঠানে তাঁর মুখে শোনা গেল সম্পূর্ণ উল্টো সুর। তাঁর এই রূপান্তর নজর এড়ায়নি বিদেশি বিশেষজ্ঞদেরও। পাকিস্তানি সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলী কে চিশতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, একসময়ের ক্লিন-শেভেন এই সেনাপ্রধান এখন ঘন দাড়ি রেখেছেন এবং তাঁর শেষ দুটি ভাষণেই তিনি সেনাবাহিনীকে ইসলামিক মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। ভৌগোলিক বা প্রশাসনিক নামের প্রথা ভেঙে হজের পর পরই সেনাপ্রধানের হাত ধরে এই ইসলামিক নামকরণের সূচনা সেনাবাহিনীর অন্দরে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম কে দাস একটি নিবন্ধে এই বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের এই নতুন ব্যাটালিয়নগুলোর যুদ্ধকালীন স্লোগান বা রণধ্বনি 'জয় বাংলা' থেকে বদলে এখন ইসলামিক 'আল্লাহু আকবর' করা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এই মৌলবাদী তৎপরতা কিছুটা চেপে রাখা হলেও, ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁর পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে এই ইসলামিক ঐতিহ্যকে আপন করে নিচ্ছে। এর পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং বাংলাদেশের জামায়াত-ই-ইসলামির গভীর আঁতাত রয়েছে বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে এই পাকিস্তানপন্থী ও ইসলামপন্থীদের পুনর্বাসনের বিপদ নিয়ে আজ থেকে পাঁচ দশক আগেই সতর্ক করেছিলেন কিউবার কিংবদন্তি বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠকে কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। কাস্ত্রো বলেছিলেন, রাজনৈতিক শত্রুদের প্রতি উদারতা দেখানো কোনও নৈতিক গুণ নয়, বরং তা চরিত্রের দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হবে। পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর যে সিদ্ধান্ত মুজিব নিয়েছিলেন, তার তীব্র বিরোধিতা করে কাস্ত্রো বলেছিলেন, "আপনি দেশের ভেতরেই এক পাল্টা-বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি করছেন।" কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই সতর্কবাণী শোনেননি, যার চরম মাশুল তাঁকে দিতে হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিজের সপরিবারে প্রাণ দিয়ে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০১২ সালেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কট্টরপন্থী অফিসারদের এক সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল তৎকালীন হাসিনা সরকার। সে সময় অন্তত ১৬ জন কট্টরপন্থী ও ধর্মান্ধ সেনা অফিসারের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছিল। চৌদ্দ বছর পর, যখন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে চর্চা চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আবার এক চরম ধর্মীয় মোড় নিল। একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর তোড়জোড়, আর অন্যদিকে সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রকে ইসলামের রঙে রাঙিয়ে তোলা—দুইয়ে মিলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ধর্মনিরপেক্ষতা এখন এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে।















