আজকাল ওয়েবডেস্ক: এপ্রিল মাসে লোকসভা অধিবেশনে ‘লোকসভা পুনর্বিন্যাস বিল, ২০২৬’ পেশ করে কেন্দ্র। বিলটিতে সারাদেশে নির্বাচনী এলাকাগুলির সীমানা পুনর্বিন্যাসের জন্য ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর লক্ষ্য লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করা। আইন ও বিচার মন্ত্রক ‘ডিলিমিটেশন বিল, ২০২৬’ পেশ করে। এই বিলের লক্ষ্য ছিল লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনী এলাকাগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা।
গোটা বিষয়টি সম্পর্কে জানার আগে আমাদের জানতে হবে সীমানা পুনর্বিন্যাস বিলটি ঠিক কী? জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলির জন্য নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণ করার প্রক্রিয়াকে সীমানা পুনর্বিন্যাস বলা হয়। সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্য ব্যবহার করে প্রতিটি রাজ্যকে লোকসভা এবং তার বিধানসভায় আসন বরাদ্দ করা হয়। যদিও নির্বাচনী এলাকাগুলির ভৌগোলিক আকার ভিন্ন হতে পারে, তবে সেগুলিকে এমনভাবে নকশা করা হয় যাতে তাদের জনসংখ্যা প্রায় সমান থাকে।
সংবিধানের ৮২ এবং ১৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সর্বশেষ আদমশুমারির ভিত্তিতে সংসদীয় ও বিধানসভা নির্বাচনী এলাকার পর্যায়ক্রমিক পুনর্নির্ধারণ বাধ্যতামূলক। সংসদ দ্বারা গঠিত একটি সীমানা নির্ধারণ কমিশন এই প্রক্রিয়াটির তত্ত্বাবধান করে। যেহেতু প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই যে রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি, তারা অধিক আসন লাভ করতে পারে। অন্যদিকে, যে রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কম, তাদের আসন সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে।
বিলের প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একটি মাত্র লোকসভা কেন্দ্র রয়েছে, তাদের বিধানসভার আসন সংখ্যা বাড়লেও সংসদে আসন সংখ্যা বাড়বে না। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর-পূর্বের তিনটি রাজ্য— সিকিম, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম এবং ছ’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। অন্যদিকে, বিজোড় সংখ্যক আসন থাকা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর তাদের আসন সংখ্যা পূর্ণ সংখ্যায় গণনা করা হবে। অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সংসদে তফসিলি জাতি (এসসি)-র প্রতিনিধিত্বও সামান্য বৃদ্ধি পাবে।
ভারত ১৯৫১, ১৯৬১ এবং ১৯৭১ সালে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাসের কাজ সম্পন্ন করেছিল। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে উৎসাহিত করতে এবং উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সম্পন্ন রাজ্যগুলি যাতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নির্বাচনী সুবিধা লাভ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ২০০১ সালে ৮৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়, যার ফলে পরবর্তী পুনর্বিন্যাসের কাজ ২০২৬ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যায়।
কেন্দ্রীয় সরকার কেন এই বিল পাশ করাতে চায়-
- এটি ভোটার ও প্রতিনিধির অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাতের সমস্যার সমাধান করে। সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করে যে, একটি ভোটের গুরুত্ব বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় সমান থাকে।
- এটি আইনসভায় নারীদের জন্য ৩৩% (এক-তৃতীয়াংশ) সংরক্ষণ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করে, যা নিশ্চিত করে যে নতুনভাবে নির্ধারিত নির্বাচনী এলাকাগুলি এই আদেশকে সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে।
- প্রস্তাবিত বিল পাশ হলে লোকসভার সামগ্রিক আকার বৃদ্ধি পাবে। এটি গণতান্ত্রিক ভিত্তি প্রসারিত করে, যার ফলে আরও বেশি সংখ্যক জনপ্রতিনিধি জনসংখ্যার সরাসরি সেবা করতে পারেন।
- এটি পুরোনো আদমশুমারির উপর ভিত্তি করে আসন বণ্টনের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং এই গণতান্ত্রিক নীতি পুনরুদ্ধার করে যে রাজ্যগুলির জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত।
- নতুন প্রস্তাবগুলি সমস্ত রাজ্যে সংসদীয় আসন বাড়িয়ে ‘উত্তর বনাম দক্ষিণ’ বিভাজন প্রশমিত করে। এর মাধ্যমে, যে রাজ্যগুলি সফলভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারা জাতীয় সংসদে আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি নিশ্চিত করে তাদের অংশ বজায় রাখে।
- এটি ভৌগোলিক সংহতি, সম্প্রদায়ের অখণ্ডতা এবং প্রশাসনিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে নির্বাচনী এলাকার মানচিত্র পুনর্গঠন করে। যার ফলে সরকার স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী আরও ভালভাবে পরিষেবা প্রদান করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু লোকসভায় আসনবৃদ্ধি সংক্রান্ত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে ব্যর্থ হয় মোদি সরকার। ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে ২৯৮টি এবং বিপক্ষে ২৩০টি ভোট পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দরকার ৩৬২টি ভোট। ওই দিন মোট ৫২৮ জন সাংসদ ভোট দিয়েছিলেন। বিল পাশ করাতে প্রয়োজন ছিল ৩২৬টি ভোটের। ভোটাভুটিতে পাশ না হওয়ায় বিলটি প্রত্যাহার করে নেয় কেন্দ্র।
লোকসভায় সীমানা পুনর্বিন্যাস বিল নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেন, সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে লাভবান হবে দক্ষিণের রাজ্যগুলি। শাহ উদাহরণ দিয়ে বলেন, সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে তামিলনাড়ু আরও ২০টি, কেরল ১০টি, তেলেঙ্গানা ৯টি এবং অন্ধ্রপ্রদেশ ১৩টি আসন পাবে। উত্তরপ্রদেশের পর লোকসভায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক সাংসদ থাকা মহারাষ্ট্র আরও ২৪টি আসন পাবে।
২০৩১ সালের আদমশুমারির উপর ভিত্তি করে পরবর্তী দফার সীমানা পুনর্বিন্যাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালের সময়সীমার আগেই এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, জনসংখ্যার বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বেড়ে ৭৫৩ হতে পারে। বর্তমানে দক্ষিণের রাজ্যগুলির দখলে রয়েছে ৫৪৩টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১২৯টি, যা বেড়ে ৭৫৩টির মধ্যে ১৪৪টি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে, আসনের সামগ্রিক অংশ ২৩.৭% থেকে কমে ১৯% হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে, উত্তরের রাজ্যগুলির বর্তমানে ২২২টি আসন রয়েছে। তাদের আসন সংখ্যা বেড়ে ৩৫৭টি হতে পারে।
















