আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজনীতি করা 'পেশা' হিসেবে এখনও যে বিপুল আর্থিক লাভের অন্যতম পথ, তা আবারও স্পষ্ট করল সাংসদদের সম্পদের বিশ্লেষণ। ২০১৪ সাল থেকে টানা তিনবার নির্বাচিত হওয়া ১০৩ জন সাংসদের মধ্যে ১০২ জনের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR) এবং ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচ (NEW)। ২০১৯ সালের হলফনামার তথ্য না থাকায় এক সাংসদের সম্পদের হিসাব এই সমীক্ষার বাইরে রাখা হয়েছে।
গড় সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি
ADR-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ সালে এই ১০২ জন সাংসদের গড় ঘোষিত সম্পদ ছিল ১৫.৭৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক দশকে গড় সম্পদ প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। লক্ষণীয়ভাবে, এই সময়কালে মাত্র একজন সাংসদই তাঁর সম্পদ কমার কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সম্পদ তুলনামূলক কম
এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচনার বিষয় হল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনও সংসদের সবচেয়ে কম সম্পদশালী সদস্যদের মধ্যে অন্যতম। ২০১৪ সালে তাঁর ঘোষিত সম্পদ ছিল এক কোটি টাকার কিছু বেশি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৯৬ কোটি টাকা। তবে তাঁর বহু মন্ত্রিসভার সহকর্মীর সম্পদ প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় অনেক বেশি।
নিতিন গডকরি – ২৮ কোটি টাকা
প্রহ্লাদ যোশী – ২১ কোটি টাকা
গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত – ১৯ কোটি টাকা
নিত্যানন্দ রাই – ১৭ কোটি টাকা
গিরিরাজ সিং – ১৪ কোটি টাকা
অনুরাগ সিং ঠাকুর – ১২ কোটি টাকা
এমনকি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত বিজেপি নেতাদের মধ্যেও রাজীব প্রতাপ রুডি (৮ কোটি টাকা) এবং কিরেন রিজিজু (৪.৯৯ কোটি টাকা) প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বেশি সম্পদ ঘোষণা করেছেন।
২০০ কোটির ক্লাবে চার সাংসদ
এই সমীক্ষার সবচেয়ে চোখে পড়া তথ্যগুলির মধ্যে অন্যতম হল চারজন সাংসদের সম্পদ ২০০ কোটি টাকার বেশি।
এর মধ্যে তিনজনই বিজেপির সাংসদ:
হেমামালিনী ধর্মেন্দ্র দেওল – ২৭৮ কোটি টাকা
উদয়নরাজে ভোঁসলে – ২২৩ কোটি টাকা
মালা রাজ্যলক্ষ্মী শাহ – ২০৬ কোটি টাকা
এই ‘২০০ কোটির ক্লাব’-এ একমাত্র বিরোধী দলের সাংসদ হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের আসানসোলের সাংসদ শত্রুঘ্ন সিনহা, যাঁর ঘোষিত সম্পদ ২১০ কোটি টাকা।
সম্পদ বৃদ্ধির হারে শীর্ষে বিজেপি সাংসদরা
সম্পদ বৃদ্ধির হার বিচার করলে শীর্ষে রয়েছেন বিজেপির দুই সাংসদ:
রাও ইন্দরজিৎ সিং (গুরুগ্রাম) – সম্পদ বৃদ্ধি ৩৮৫ শতাংশ (২০১৪ সালে ২৫ কোটি থেকে ২০২৪ সালে ১২১ কোটি)
নিশিকান্ত দুবে (গড্ডা) – সম্পদ বৃদ্ধি ৩৮০ শতাংশ (১৫ কোটি থেকে ৭৪ কোটি)
বিরোধী সাংসদদের সম্পদের চিত্র
বিরোধী শিবিরের একাধিক পরিচিত নেতাও এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হিসেবে উঠে এসেছেন:
হরসমরত কৌর বাদাল – ১৯৮ কোটি টাকা
সুপ্রিয়া সুলে – ১৬৬ কোটি টাকা
শশী থারুর – ৫৬ কোটি টাকা
ডিম্পল যাদব – ৪২ কোটি টাকা
দীপক অধিকারী (দেব) – ৩৭ কোটি টাকা
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় – ৩০ কোটি টাকা
আসাদউদ্দিন ওয়াইসি – ২৩ কোটি টাকা
রাহুল গান্ধী – ২০ কোটি টাকা
লোকসভা স্পিকারের সম্পদেও বড় লাফ
লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ২০১৪ সালে যেখানে ২ কোটি টাকার সম্পদ ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে ২০২৪ সালে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি টাকা।
‘চমকপ্রদ’ সম্পদ বৃদ্ধি
উদয়নরাজে ভোঁসলের পাশাপাশি আরও কয়েকজন সাংসদের সম্পদ বৃদ্ধিকে রিপোর্টে ‘spectacular’ বা চমকপ্রদ বলা হয়েছে:
পুনমবেন মাদাম (বিজেপি) – ১৭ কোটি থেকে ১৪৭ কোটি
পি.ভি.এম. রেড্ডি (ওয়াইএসআরসিপি) – ২২ কোটি থেকে ১৪৬ কোটি
শ্রীরঙ্গ আপ্পা চন্দু বারনে (শিব সেনা) – ৬৬ কোটি থেকে ১৩১ কোটি
একমাত্র ব্যতিক্রম: সম্পদ কমেছে যাঁর
সমীক্ষায় একমাত্র বিজেপির নবসারি সাংসদ সি. আর. পাটিল তাঁর সম্পদ কমার কথা জানিয়েছেন। ২০১৪ সালে যেখানে তাঁর সম্পদ ছিল ৭৪ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৩৯ কোটি টাকায়।
দলভিত্তিক হিসাব
১০২ জন পুনর্নির্বাচিত সাংসদের মধ্যে দলভিত্তিক সংখ্যা হল:
বিজেপি – ৬৫ জন
তৃণমূল কংগ্রেস – ১১ জন
কংগ্রেস – ৮ জন
শিব সেনা (শিন্ডে গোষ্ঠী) – ৩ জন
রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন
ADR-এর এই রিপোর্ট আবারও ভারতীয় রাজনীতিতে অর্থ ও ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সামনে এনেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একাংশের সম্পদের বিপুল বৃদ্ধি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির চরিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
