আজকাল ওয়েবডেস্ক: অনেকে বলেন বার্লিন প্রাচীরের পতনের সাথে সাথেই নাকি দুনিয়া থেকে সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের অবসান ঘটেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর ইতিহাসবিদেরাও অনেকে এই তত্ত্বের ওপর সিলমোহর দিয়েছিলেন। কিন্তু তামিলনাড়ুর মাদুরাই জেলার পেরাইয়ুর তালুকের একটি ছোট্ট গ্রাম 'ভান্নিভেলামপাত্তি' বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে এই দাবিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আসছে। এখানে কমিউনিজম কোনও  বইয়ের পাতা বা তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং মানুষের যাপিত জীবন ও আত্মমর্যাদার এক জীবন্ত দলিল। গ্রামের মানুষ কেবল মুখে সাম্যবাদের কথা বলেন না, গত ৫০ বছর ধরে তাঁরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে এবং সন্তানদের নামের অক্ষরে অক্ষরে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই বিপ্লবের আগুন।

ভান্নিভেলামপাত্তি গ্রামে গিয়ে যদি আপনি যেকোনও  ১০ জন বাসিন্দার নাম জিজ্ঞেস করেন, তবে অবাক হয়ে দেখবেন তাদের মধ্যে অন্তত ৮ জনের নাম রাখা হয়েছে কোনও  না কোনও  বিশ্বখ্যাত কমিউনিস্ট নেতার নামে। গ্রামে পা রাখলেই কান পাতলে শোনা যায় কার্ল মার্ক্স, ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্টালিন, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কিংবা ফিদেল কাস্ত্রোর মতো ডাক। এমনকি যাদের কাগজে-কলমে এমন নাম নেই, পাড়ার আড্ডায় বা বন্ধুদের দেওয়া তাদের ডাকনামেও জড়িয়ে থাকে লেনিন বা মার্ক্সের ছোঁয়া। এটি কোনও  সাময়িক ট্রেন্ড বা ফ্যাশন নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ সামাজিক রূপান্তর ও শোষণের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা তথা সিপিআই(এম) নেতা ভি মুরুগান, যাঁকে সবাই ভালোবেসে 'স্টালিন' বলে ডাকেন, তিনি জানালেন সেই লড়াইয়ের দিনগুলোর কথা। ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত এই গ্রামের অবদমিত মানুষগুলো তাঁদের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন না। যুগের পর যুগ ধরে তাঁরা উচ্চবর্ণের ভূস্বামীদের জমিতে খেতমজুর হিসেবে প্রায় ক্রীতদাসের মতো খাটতেন। ১৯৫২ সালে এই গ্রামেরই এক লড়াকু যুবক ভেম্বুলু কাজের খোঁজে তাঞ্জাভুরে যান এবং সেখানেই তিনি প্রথম সাম্যবাদী ভাবধারার সংস্পর্শে আসেন। তিন বছর পর গ্রামে ফিরে তিনি তাঁর বন্ধুদের সংগঠিত করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির একটি বড় কৃষক সম্মেলনে যোগ দেন। সেই সম্মেলনই গ্রামের মেহনতি মানুষের ভেতরের চেতনাকে প্রথম জাগিয়ে তুলেছিল।

কমিউনিস্ট নেতাদের ধারাবাহিক সান্নিধ্য ও নিয়মিত রাজনৈতিক সভার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পুরো গ্রামের ভোল বদলে যায়। তাঁরা গ্রামবাসীদের আইনি উপায়ে এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পথ দেখান। মুরুগানের ভাষায়, আজ এই গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবারগুলোও নিজস্ব জমির মালিক—যা একসময় অলীক স্বপ্ন বলে মনে হতো। এই মুক্তির আনন্দ থেকেই ১৯৬০-এর দশক থেকে গ্রামবাসীরা ভালোবেসে ও শ্রদ্ধায় তাঁদের সন্তানদের নাম কমিউনিস্ট নেতাদের নামে রাখতে শুরু করেন, যা আজো সমানভাবে চলছে।

এই নাম রাখার চল কেবল কোনও  অন্ধ আবেগ নয়, বরং সচেতনভাবে লড়াইয়ের উত্তরাধিকারকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এক অনন্য প্রয়াস। ২৬ বছর বয়সী মা কে নাগাজ্যোতি যেমন সগর্বে জানান যে তাঁর দুই মেয়ের নাম তিনি রেখেছেন 'মার্ক্সিয়া' ও 'লেনিনা'। তিনি চান তাঁর কন্যারা যেন এই বিশ্বনেতাদের মতোই সাহস ও নিষ্ঠা নিয়ে সমাজের মানুষের জন্য কাজ করতে পারে।

তামিলনাড়ুর এই প্রত্যন্ত গ্রামের অনুন্নত পরিকাঠামো যেখানে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা বা এটিএম হয়তো এখনো পৌঁছায়নি, গ্রামের যুবসমাজ এখন 'পাঠচক্র' বা রিডিং ক্লাবের মাধ্যমে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মার্ক্সীয় সাহিত্য ও ইতিহাস পড়তে উৎসাহিত করছে, যাতে তারা পূর্বপুরুষদের কঠিন সংগ্রাম এবং আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার গল্প ভুলে না যায়। ভান্নিভেলামপাত্তি আজো প্রমাণ করে চলেছে, আদর্শ যদি মানুষের অধিকারের সাথে মিশে যায়, তবে কোনো প্রাচীর ভেঙেই তাকে দুনিয়া থেকে মুছে ফেলা যায় না।