আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের অন্যতম বিপজ্জনক সাপ রাসেল ভাইপার ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত দেশজুড়ে যে অঞ্চলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমশ বেশি উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে পড়ছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, কোনও অঞ্চলের আবহাওয়া সেই এলাকার রাসেল ভাইপারের বিষের গঠন ও তীব্রতা নির্ধারণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুষ্ক অঞ্চলে ধরা সাপগুলির বিষে টিস্যু নষ্টকারী প্রোটিন এনজাইম বা প্রোটিয়েজের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর ফলে সাপের কামড়ে মানুষের দেহে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। গবেষকরা বলছেন, এই তথ্য ভবিষ্যতে কোনও অঞ্চলে সাপের কামড়ে কী ধরনের উপসর্গ দেখা দেবে বা কোন চিকিৎসা সবচেয়ে দ্রুত কাজ করবে—তা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।


ভারতে সাপের কামড়ে মৃত্যুর প্রধান কারণ রাসেল ভাইপার। গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে একে পাওয়া যায় এবং প্রতি বছর ভারতে সাপের কামড়ে হওয়া মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৩ শতাংশের জন্য এই সাপ দায়ী। বিস্তৃত বিস্তার ও মানুষের বসতির কাছে ঘোরাফেরা করার ফলে এই সাপ বিশেষভাবে বিপজ্জনক। তবে একটি বড় সমস্যা হল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাসেল ভাইপারের বিষের গঠন একই রকম নয়। কোথাও কামড়ে রক্তক্ষরণের সমস্যা, কোথাও পেশি বা টিস্যু ক্ষয়, আবার কোথাও স্নায়ুজনিত জটিলতা দেখা যায়। এতদিন মনে করা হত বিষে থাকা বিভিন্ন এনজাইমের মাত্রার পার্থক্যই এই উপসর্গ পরিবর্তনের কারণ, কিন্তু কেন এই পার্থক্য তৈরি হয় তা জানা ছিল না।


গবেষণায় উঠে এল জলবায়ুর ভূমিকা
এই রহস্য সমাধান করেছেন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের ড. কার্তিক সুনগার ও তাঁর দল। তাঁরা ভারতের ৩৪টি ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা ১১৫টি রাসেল ভাইপারের বিষ পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন ধরনের এনজাইম—প্রোটিন প্রোটিয়েজ, ফসফোলিপেজ, অ্যামিনো অ্যাসিড এনজাইম—সবই পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় ওই অঞ্চলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু তথ্য।


গবেষণার ফলাফল
বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা উভয়ই বিষের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। শুষ্ক ও কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চল বিশেষত ভারতের উত্তর-পশ্চিমে—রাসেল ভাইপার বিষে প্রোটিয়েজ এনজাইমের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর বিপরীতে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের আর্দ্র অঞ্চলে বেশি পাওয়া যায় ফসফোলিপেজ যা কোষঝিল্লি ধ্বংস করে ব্যথা, প্রদাহ ও টিস্যুর ক্ষতি ঘটায়।


চিকিৎসায় অঞ্চলভিত্তিক পরিবর্তনের প্রয়োজন
এই নতুন তথ্য চিকিৎসকদের হাতে এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। সাপের কামড়ে কোন অঞ্চল থেকে রোগী এসেছে, তার ওপর ভিত্তি করে এখন আরও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বেছে নেওয়া সম্ভব। যেমন—উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রোটিয়েজ-নির্দেশিত থেরাপি বা টক্সিন-নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি বেশি কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে পূর্ব ভারতে PLA2–নির্দিষ্ট অ্যান্টিভেনম বা ওষুধ বেশি কাজে লাগতে পারে।


গবেষকরা ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাসেল ভাইপার বিষের ধরন অনুযায়ী একটি 'পূর্বাভাস মানচিত্র' তৈরি করেছেন। এটি ভবিষ্যতে অঞ্চলভিত্তিক অ্যান্টিভেনম, রিকম্বিন্যান্ট অ্যান্টিবডি বা ছোট-মলিকিউল ইনহিবিটর তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।


জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—ভারতে আগামী দশকে তাপপ্রবাহ, খরা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়বে। এর ফলে সাপের বিষের গঠন আরও বদলাতে পারে। বিষ কম প্রাণঘাতী হবে নাকি আরও মারাত্মক হয়ে উঠবে—এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে গবেষকদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তন যে রাসেল ভাইপারের বিষের তীব্রতা ও ধরনে প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত।