আজকাল ওয়েবডেস্ক: লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী শুক্রবার সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রস্তাবিত ভারত–আমেরিকা অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে এই বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বিশেষ করে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের জীবিকা সুরক্ষার প্রশ্নই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কংগ্রেস সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে উপস্থিত কৃষক নেতারা চুক্তিটির তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে ভুট্টা, সয়াবিন, তুলা, ফল ও বাদাম উৎপাদকদের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি কৃষিপণ্যের আমদানি বাড়লে দেশীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না—এমন উদ্বেগই উঠে আসে আলোচনায়। রাহুল গান্ধীও মত দেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে আমদানির দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে এবং শীঘ্রই অন্যান্য ফসলও এর আওতায় পড়তে পারে।
বৈঠকে সম্ভাব্য সর্বভারতীয় আন্দোলনের রূপরেখা নিয়েও আলোচনা হয়। কংগ্রেসের বক্তব্য, গ্রামীণ আয় এবং খাদ্য সুরক্ষা রক্ষায় বৃহত্তর জনমত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
এই বৈঠক এমন এক সময়ে হল, যখন বাজেট অধিবেশনে রাহুল গান্ধী বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রকে আক্রমণ করছেন। লোকসভায় সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি সরকারের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর যুক্তি, বাণিজ্য বা পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের সময় দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও মানুষের জীবিকাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। খাদ্য সুরক্ষা ও গ্রামীণ সঙ্কটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য কৃষকদের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া চলবে না।
সংসদের বাইরে তাঁর ভাষা আরও আক্রমণাত্মক। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, এই চুক্তি দেশের কৃষকদের স্বার্থ বিরোধী এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপসের সামিল। তিনি বলেন, “এফআইআর করুন, মামলা দিন বা প্রিভিলেজ মোশন আনুন—আমি কৃষকদের জন্য লড়বই।” তাঁর কথায়, “যে কোনও বাণিজ্য চুক্তি যদি কৃষকের জীবিকা কেড়ে নেয় বা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল করে, তা কৃষকবিরোধী। আমরা কৃষকদের অন্নদাতা হিসেবে সম্মান করি। তাঁদের স্বার্থে কোনও আপস মেনে নেওয়া হবে না।”
&t=781sএকইসঙ্গে তিনি চুক্তিটিকে ‘সেল আউট’ বলেও আখ্যা দেন এবং অভিযোগ করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দেশকে কার্যত ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক বার্তায় এই অভিযোগ এখন কেন্দ্রীয় স্থান পেয়েছে।
অন্যদিকে কেন্দ্র সরকার এই সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের দাবি, অন্তর্বর্তী এই বাণিজ্য ব্যবস্থা সুচিন্তিত এবং দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যেই তা করা হয়েছে। একাধিক মন্ত্রী রাহুলের বক্তব্যকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন। ফলে চুক্তি ঘিরে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য আরও তীব্র হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য, মার্কিন প্রশাসন এই প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে একাধিক সরকারি বিবৃতি দিয়েছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তরফে এখনও তেমন কোনও বিশদ সরকারি ব্যাখ্যা সামনে আসেনি—যা বিরোধীদের সমালোচনাকে আরও জোরালো করছে।
শুক্রবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অল ইন্ডিয়া কিসান কংগ্রেসের প্রধান সুখপাল সিং খাইরা, হরিয়ানার ভারতীয় কিসান মজদুর ইউনিয়নের অশোক বালহারা, বিকেইউ ক্রান্তিকারীর বলদেব সিং জিরা, প্রোগ্রেসিভ ফার্মার্স ফ্রন্টের আর. নন্দকুমার, বিকেইউ শহিদ ভগত সিংয়ের অমরজিৎ সিং মোহরি, কিসান মজদুর মোর্চা–ইন্ডিয়ার গুরমনীৎ সিং মঙ্গত এবং জম্মু-কাশ্মীর জমিদারা ফোরামের হামিদ মালিক-সহ আরও অনেকে।
কংগ্রেসের দাবি, বৈঠকে কৃষক নেতারা এবং রাহুল গান্ধী একমত হন যে কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় বৃহৎ আকারের প্রচার ও আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। সংসদের ভেতরে আক্রমণের পাশাপাশি এখন সংগঠিত জনমত গড়ার দিকে জোর দিচ্ছে বিরোধী দল।
ভারত–আমেরিকা অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত ইস্যু হয়ে উঠেছে। সংসদে তর্ক-বিতর্কের পাশাপাশি রাস্তায় ও সামাজিক মাধ্যমে এই প্রশ্নে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে। রাহুল গান্ধীর এই কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ তাই কেবল একটি বৈঠক নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে—যেখানে কৃষক ও খাদ্য সুরক্ষার প্রশ্নকে সামনে রেখে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে চাইছে কংগ্রেস।
