আজকাল ওয়েবডেস্ক: নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য সরকারের দড়িটানাটানি ভারতীয় রাজনীতির এক পুরনো অধ্যায় হলেও, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে আমলাতন্ত্রের এই ব্যাপক ও নজিরবিহীন রদবদল এক চরম নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ৮ এপ্রিল ভারতের নির্বাচন কমিশন এক কড়া নির্দেশে বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলোতে শীর্ষ স্তরের আমলাদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে সরকারের দুই প্রধান স্তম্ভ—মুখ্য সচিব এন. মুরুগানন্দম এবং পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (ভিজিল্যান্স ও দুর্নীতি দমন) এস. ডেভিডসন দেব আশীর্বাদকে বদলি করার বিষয়টি শাসক দল ডিএমকে-র কাছে কার্যত এক বড় ধাক্কা। তাঁদের জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এম. সাই কুমার এবং অভিজ্ঞ আইপিএস অফিসার সন্দীপ মিত্তালকে। কমিশন এই রদবদলকে ‘নির্বাচনী প্রস্তুতি’ হিসেবে বর্ণনা করলেও, অপসারিত আধিকারিকদের ভোট মেটা পর্যন্ত কোনও  নির্বাচনী দায়িত্বে রাখা যাবে না বলে যে ফতোয়া জারি করা হয়েছে, তা থেকেই এই পদক্ষেপের গুরুত্ব অনুধাবন করা যাচ্ছে।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিন রীতিমতো অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে সরাসরি ‘এক্তিয়ার বহির্ভূত’ এবং ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে আক্রমণ শানিয়েছেন। সমাজমাধ্যমে করা একটি সুদীর্ঘ পোস্টে স্ট্যালিন অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপি এবং এআইএডিএমকে জোটবদ্ধ হয়ে যে নির্বাচনী অনিয়মের নীল নকশা তৈরি করেছে, কমিশন যেন সেই চক্রান্তকে সফল করতেই অতি উৎসাহের সাথে আমলাতন্ত্রে হাত দিয়েছে। ২৩ এপ্রিল তামিলনাড়ুর ২৩৪টি আসনে ভোট গ্রহণ হতে চলেছে, তার ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে সরকারের শীর্ষ আধিকারিকদের সরিয়ে দেওয়া প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। যদিও প্রধান বিরোধী দল এআইএডিএমকে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে, অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে এটি একটি অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গও। তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত এই রাজ্যে কমিশন নজিরবিহীনভাবে ৪৮৩ জন প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিককে একসাথে বদলি করার নির্দেশ দিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট এই নির্দেশকে বৈধতা দিলেও তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, এটি আসলে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার একটি কৌশল। বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অসমের চিত্রটি। বিজেপি শাসিত অসমে এই বদলির হার আশ্চর্যজনকভাবে নগণ্য—সেখানে মাত্র পাঁচজন জেলা পুলিশ সুপার এবং কয়েকজন স্থানীয় আধিকারিককে বদল করা হয়েছে। বিরোধী রাজ্যগুলোতে যেখানে গণ-বদলি চলছে, সেখানে বিজেপি শাসিত রাজ্যে কমিশনের এই ‘নরম’ মনোভাব কেন, সেই প্রশ্ন তুলে ইভিএম ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা—প্রতিটি বিষয়ে কমিশনের নিরপেক্ষতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে দেশজুড়ে এক গভীর উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিতকরণ বা 'এসআইআর' (SIR) প্রক্রিয়ায় যেভাবে বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলোর পুলিশি কাঠামোকে তছনছ করে দেওয়া হচ্ছে, তাকে অনেকেই ‘প্রশাসনিক একনায়কতন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। এককালের দাপুটে এবং স্বতন্ত্র এই সাংবিধানিক সংস্থাটি এখন শাসক দলের প্রতি নরম মনোভাব দেখাচ্ছে কিনা, সেই বিতর্কের মাঝেই দেশের ভোট-ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কমিশন অবশ্য বরাবরই রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে জানিয়ে আসছে যে, তারা কোনও  বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, বরং নির্বাচনী ময়দানকে সকলের জন্য সমান (Level playing field) রাখতেই এমন কড়া দাওয়াই প্রয়োগ করছে। তবে ভোট যত এগিয়ে আসছে, নিরপেক্ষতার এই লড়াই ততই রাজপথ থেকে আদালতের আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ছে।