আজকাল ওয়েবডেস্ক: "আমরা ছয় মাসে একটা সাইকেল কেনার ক্ষমতা রাখি না, আর ওরা প্রতি মাসে নতুন নতুন বিএমডাব্লিউ (BMW) কেনে! কোত্থেকে আসে এত টাকা? প্রতি মাসে লোকসান দেখালেও ওরা কোটি টাকার বাড়ি আর গাড়ি ঠিকই কিনছে। আমরা ১১,৫০০ টাকায় কী করব?" — নয়ডার সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনের উত্তাল আবহে এক কারখানা শ্রমিকের এই হাহাকার আজ ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 'ন্যাশনাল হেরাল্ড' (National Herald)-এ প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে দেশের এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের এক গভীর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

নয়ডার সেক্টর ৮০-তে যখন শ্রমিক অসন্তোষ এবং পুলিশের ধরপাকড় নিয়ে উত্তেজনা চরমে, তখন এই শ্রমিকের প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং ভারতের শ্রমজীবী মানুষের সম্মিলিত যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। একদিকে যেখানে সাধারণ মানুষ মুদ্রাস্ফীতির চাপে নুয়ে পড়ে একটি সাধারণ সাইকেল কিনতেও হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে পুঁজিপতিদের সম্পদ ও বিলাসবহুল ভোগবিলাস ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এই তুলনাটি ভারতের শ্রম ও পুঁজির মধ্যেকার বিশাল দূরত্বকে স্পষ্ট করে দেয়।

ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশেরও বেশি এখন মাত্র ১ শতাংশ ধনকুবেরের হাতে। বিপরীতে, দেশের নিচের সারির ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ সম্পদ। অক্সফ্যামের সমীক্ষাও একই কথা বলছে—১০ শতাংশ মানুষের দখলে রয়েছে দেশের ৭৭ শতাংশ সম্পদ। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের এই অর্থনৈতিক বৈষম্য এখন ব্রিটিশ আমলের থেকেও ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৃদ্ধি ঘটলেও তার সুফল সাধারণ মজুরিভোগী মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

প্রাক্তন আরবিআই গভর্নর রঘুরাম রাজন এবং নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার এই ‘অসম পুনরুদ্ধারের’ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। কোভিড অতিমারির পরবর্তী সময়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী হলেও সাধারণ মানুষের সঞ্চয় তলানিতে ঠেকেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের এই উন্নয়ন এখন ‘কে-শেপড’ (K-shaped) গতিতে চলছে, যেখানে একদল দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছাচ্ছে, আর অন্যদল ক্রমশ দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে।

নয়ডার রাস্তায় যে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে, তা কেবল বেতন বৃদ্ধির দাবি নয়, বরং এক গভীর সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। যখন হাড়ভাঙা খাটুনি দেওয়া শ্রমিকের আয় স্থবির হয়ে থাকে এবং তার চোখের সামনে মালিকের বিলাসিতা বাড়তে থাকে, তখন সেই বৈষম্য আর কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রাত্যহিক জীবনের এক নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা। ন্যাশনাল হেরাল্ডের এই বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আকাশচুম্বী বৈষম্যকে নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যথায় প্রবৃদ্ধির সুফল কেবল গুটিকয়েক মানুষের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকবে।