আজকাল ওয়েবডেস্ক: লোকসভায় বামপন্থী চরমপন্থা বা মাওবাদী দমন নিয়ে বিতর্কের সূত্র ধরে ফের একবার সম্মুখসমরে বিজেপি এবং বামপন্থীরা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মাওবাদী হিংসার জন্য সরাসরি কংগ্রেসকে কাঠগড়ায় তোলার পাশাপাশি কমিউনিস্টদের ‘বিদেশি অনুপ্রেরণা’ ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম দলের তাত্ত্বিক মুখপত্র ‘মার্কসবাদী পথ’-এ এক দীর্ঘ নিবন্ধে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও সমাজ নির্মাণে কমিউনিস্টদের ঐতিহাসিক ভূমিকার খতিয়ান তুলে ধরেছেন।
লোকসভায় দাঁড়িয়ে অমিত শাহ দাবি করেন, মাওবাদ নির্মূল করার জন্য যে ‘দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি’ প্রয়োজন, তা একমাত্র নরেন্দ্র মোদি সরকারের রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ১৯২৫ সালে রাশিয়ায় কমিউনিস্ট সরকার গঠনের অনুপ্রেরণায় ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হয়েছিল, তাই তাদের পক্ষে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করা অসম্ভব। শাহের আরও সংযোজন, মোদি সরকার আসার পর ৩৭০ ধারা রদ বা রাম মন্দির নির্মাণের মতো বড় কাজ হয়েছে, যা পূর্বতন ‘মজবুর’ সরকারগুলো করতে পারেনি।
অমিত শাহের এই ‘বিদেশি তত্ত্ব’ ও ‘দেশপ্রেম’-এর সংজ্ঞাকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন মহম্মদ সেলিম। সেলিমের প্রশ্ন— “কমিউনিস্টরা কি ভারতীয় নয়? কমিউনিস্টদের চেয়ে তবে কে বেশি ভারতীয়?” তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯২১ সালে আমেদাবাদ কংগ্রেসে মওলানা হসরত মোহানি এবং স্বামী কুমারানন্দের মতো কমিউনিস্টরাই প্রথম ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’র দাবি তুলেছিলেন, যা গান্ধীজি তখন মেনে নেননি। ১৯৪৩ সালে পার্টির প্রথম কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের মোট কারাবাসের সময়কাল ছিল ৪১১ বছর। কল্পনা দত্ত বা কমলা চ্যাটার্জিদের মতো বিপ্লবীদের উদাহরণ টেনে সেলিম প্রশ্ন তুলেছেন, সাভারকার বা বাজপেয়ীর মতো যাঁরা ‘মুচলেকা’ দিয়েছিলেন, তাঁদের দেশপ্রেম কি ত্যাগের চেয়ে বড়?
তেভাগা, তেলেঙ্গানা আন্দোলন থেকে শুরু করে জমি সংস্কার এবং ১৯৩১ সালে অস্পৃশ্যতা বিলোপের ডাক— আধুনিক ভারতের প্রতিটি প্রগতিশীল পদক্ষেপে কমিউনিস্টদের নির্ণায়ক ভূমিকা ছিল বলে তিনি দাবি করেন। শাহ যখন কমিউনিস্টদের ‘রুশপন্থী’ বলে দেগে দিতে চেয়েছেন, সেলিম তখন রবীন্দ্রনাথ ও মার্কসকে এক সারিতে বসিয়েছেন। তাঁর দাবি, কমিউনিস্টরা একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক এবং আন্তর্জাতিকতাবাদী। দিল্লির এ কে গোপালন ভবন বা বাংলার মুজফ্ফর আহমেদ ভবনে মার্কস-লেলিনের চেয়েও রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি ও প্রভাব অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। উল্টোদিকে, আরএসএস-এর খাকি হাফপ্যান্ট বা লাঠি-ত্রিশূলের সংস্কৃতিকে ‘অ-ভারতীয়’ বলে কটাক্ষ করেছেন তিনি।
পরিশেষে, মহম্মদ সেলিম অমর্ত্য সেনের শান্তিনিকেতনের বক্তৃতার রেশ ধরে জানিয়েছেন যে, কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংস্কৃতিই একমাত্র ভারতীয় সংস্কৃতি নয়। যা কিছু ভালো, তাকে গ্রহণ করাই ভারতীয় ঐতিহ্য। আরএসএস-এর ‘খণ্ডিত জাতীয়তাবাদ’-এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানের কলিতেই শাহের বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন— ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া’। অমিত শাহের রাজনৈতিক আক্রমণ এবং সেলিমের ঐতিহাসিক প্রতি-আক্রমণ— সব মিলিয়ে বিতর্ক এখন জাতীয়তাবাদের মূল শিকড়ে গিয়ে ঠেকেছে।















