আজকাল ওয়েবডেস্ক: “রক্ত লেগে আছে তোমার হাতে, বিশ্বাসঘাতক নেমচা কিপগেন”—এই স্লোগানেই উত্তাল হয়ে উঠল কুকি-জো সম্প্রদায়ের একাংশ। মণিপুরের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নেমচা কিপগেনের শপথগ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই যে গভীর ক্ষোভ ও বিশ্বাসভঙ্গের অনুভূতি তৈরি হয়েছে, এই স্লোগানই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
প্রায় এক বছর ধরে রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে থাকা মণিপুরে অবশেষে নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইম্ফলে দায়িত্ব নেন ইউমনাম খেমচন্দ সিং। তবে সরকার গঠনের এই প্রক্রিয়া শুরু থেকেই বিতর্কে ঘেরা। বিজেপি ‘অন্তর্ভুক্তির’ বার্তা দিতে কুকি-জো সম্প্রদায়ের কয়েকজন বিধায়ককে নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেও, বহু কুকি-জো মানুষের কাছে এই সিদ্ধান্ত ক্ষত সারানোর বদলে পুরনো ক্ষত আরও উসকে দিয়েছে।
বুধবার দিল্লির মণিপুর ভবনের সামনে প্রায় ৫০ জন কুকি-জো মানুষ জড়ো হয়ে নেমচা কিপগেনের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জানান। তাঁদের অভিযোগ, যে সরকার কুকি-জো জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, নেমচা তাতে যোগ দিয়ে সেই ব্যর্থতাকেই বৈধতা দিয়েছেন।
মণিপুরের লোক ভবনে খেমচন্দ সিং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এবং নাগা পিপলস ফ্রন্টের বিধায়ক লোসি দিখো উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেও, নেমচা কিপগেন শপথ নেন দিল্লির মণিপুর ভবনে। ইম্ফল উপত্যকায় প্রবেশাধিকার না থাকায়—যেখানে এখনও কুকি-জো মানুষদের যাওয়া কার্যত অসম্ভব—এই সিদ্ধান্ত প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।
&t=2sপ্রতিবাদস্থলে দাঁড়িয়ে হইনু নামে এক কুকি-জো মহিলা বলেন, “আমাদের মানুষ খুন হয়েছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পুরো প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় কীভাবে তিনি আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন? তিনি কুকি সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে একা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে তিনি এই সরকারে যোগ দিতে পারেন না। আমরা মেইতেইদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে পারি না—আমাদের জন্য একসঙ্গে থাকা মানেই মৃত্যু।”
হইনু একসময় ইম্ফলেই থাকতেন, কিন্তু ২০২৩ সালের মে মাসে জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে আর নিজের বাড়িতে ফেরা হয়নি তাঁর। প্রায় ৩৩ মাস ধরে মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠী কার্যত বিচ্ছিন্ন, ইম্ফল উপত্যকা ও পাহাড়ি এলাকার মাঝে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে।
কুকি স্টুডেন্টস’ অর্গানাইজেশন (এনসিআর)-এর সভাপতি টিংবেম দ্য ওয়্যার-কে বলেন, “আমাদের মানুষদের নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছে, কুপিয়ে মারা হয়েছে, খুন করা হয়েছে—তখন তিনি একটি কথাও বলেননি। আজ তিনি আমাদের নেতা হতে চান? না। তাঁকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে, কারণ তিনি আমাদের প্রতিনিধি নন।”
মণিপুরে সরকার গঠনের আগে মঙ্গলবার সব বিজেপি ও এনডিএ বিধায়ককে দিল্লিতে ডাকা হয়েছিল। কুকি-জো বিধায়কদের সঙ্গেও আলাদা করে বৈঠক করে কেন্দ্র। ৬০ সদস্যের বিধানসভায় কুকি-জো বিধায়ক রয়েছেন ১০ জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ওই বৈঠকে যোগ দেন। বিজেপির সাতজন কুকি-জো বিধায়কের মধ্যে নেমচা কিপগেন ছাড়াও এল. এম. খাউটে ও ন্গুরসাংলুর সানাতে নতুন সরকারকে সমর্থন জানিয়েছেন।
শপথগ্রহণের আগেই কুকি-জো নেতৃত্ব ‘গুয়াহাটি ডিক্লারেশন’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই ঘোষণায় বলা হয়েছিল, পাহাড়ি এলাকার জন্য পৃথক প্রশাসন—বিধানসভাসহ একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল—মেনে না নেওয়া পর্যন্ত কোনও জনপ্রিয় সরকারে অংশগ্রহণ করা হবে না। কুকি-জো কাউন্সিলের নেতা গিনজা ভুয়ালজং স্পষ্ট করে জানান, এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হলে তা হবে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
বুধবার সন্ধ্যায় মণিপুর ভবনের বাইরে জমায়েত হওয়া প্রতিবাদকারীরা বারবার নেমচা কিপগেনকে বাইরে এসে তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দাবি জানান। তবে কর্তৃপক্ষ কোনও সাক্ষাতের অনুমতি দেয়নি। শেষ পর্যন্ত নেমচার ছবি লাগানো পোস্টারে আগুন ধরান প্রতিবাদকারীরা। দিল্লি পুলিশ হস্তক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয় এবং কোনও আলোচনা ছাড়াই প্রতিবাদের সমাপ্তি ঘটে।
দ্য ওয়্যার নেমচা কিপগেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে, নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়েও মণিপুরের জাতিগত বিভাজন ও ক্ষত যে এখনও গভীর, কুকি-জো সম্প্রদায়ের এই প্রতিবাদ তা আবারও সামনে এনে দিল।
