আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি: বাংলায় বামফ্রন্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে দেড় দশক আগে, ত্রিপুরায় আট বছর। এখন কার্যত বাম রাজনীতির শেষ প্রধান ঘাঁটি কেরল। সেই কেরলেই টানা দশ বছরের শাসনের পর শাসক‌ শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া জোরদার হয়েছে বলে দাবি করছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দক্ষিণের এই রাজ্যে রাজনৈতিক‌ পারদ চড়ছে। পরপর দু’বার ক্ষমতায় ফেরা বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ)-এর নেতৃত্বে রয়েছেন সিপিএমের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। ২০১৬ ও ২০২১ সালে জয়ের মাধ্যমে কেরলের দীর্ঘদিনের পাঁচ বছরে পালাবদলের রীতি ভেঙেছিল এলডিএফ। ফলে এবারের ভোট শুধু নিয়মিত নির্বাচন নয়, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বনাম পরিবর্তনের লড়াই হিসেবেই দেখছে পর্যবেক্ষকরা।
ইউডিএফ শিবিরের বক্তব্য, দশ বছরের শাসনে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া বইছে রাজ্যে। একাধিক বিতর্ক, আর্থিক চাপে রাজ্যের অবস্থান, বেকারত্বের প্রশ্ন এবং মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে জনমানসে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, সরকার উন্নয়নের প্রচার করলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। অন্যদিকে শাসক এলডিএফের পাল্টা যুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনিক দক্ষতাই তাদের শক্তি। কোভিড পর্বে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও বন্যা-পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ তুলে ধরছে শাসক জোট। তাদের দাবি, স্থিতিশীল নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞ প্রশাসনই কেরলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠনগত প্রস্তুতিতে ঝাঁপিয়েছে কংগ্রেস। সম্প্রতি প্রচার কমিটি গঠন করে আহ্বায়ক করা হয়েছে বর্ষীয়ান নেতা রমেশ চেন্নিথালাকে এবং সহ-আহ্বায়ক করা হয়েছে সাংসদ শশী থারুরকে। এই সমীকরণ ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে—জোট জিতলে মুখ্যমন্ত্রী পদে কাকে সামনে আনা হবে? দলীয় সূত্রে আপাতত স্পষ্ট করা হয়েছে, নির্বাচনের আগে কোনও মুখ ঘোষণা করা হবে না; ফল প্রকাশের পর পরিস্থিতি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবে হাইকমান্ড। তবে কেরল কংগ্রেসের অন্দরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বাড়ছে। একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতা ও সংগঠনগত গুরুত্বের নিরিখে কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেণুগোপালের নামও আলোচনায় রয়েছে।

 মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীর দৌড়ে তাঁকে এগিয়ে রাখছেন অনেকেই। তবে কেরল ভোটের আগে বিতর্কও কম হচ্ছেনা। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা মণিশঙ্কর আয়ার সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নের প্রশাসনিক কাজের প্রশংসা করে মন্তব্য করেছেন, ফের কেরলের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন বিজয়ন। এই মন্তব্যে কংগ্রেস অস্বস্তিতে পড়েছে। দল দ্রুত জানিয়ে দিয়েছে, এটি আয়ারের ব্যক্তিগত মত, দলের অবস্থান নয়। বিরোধীরা অবশ্য এই মন্তব্যকে হাতিয়ার করে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অন্তর্কলহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেরলের রাজনীতিতে পালাবদল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। কিন্তু গত এক দশকে সেই ধারা বদলেছে। এবারের নির্বাচন তাই এক অর্থে জনমতের পরীক্ষাও বটে—ভোটাররা কি স্থিতিশীলতার পক্ষে রায় দেবেন, নাকি পরিবর্তনের পক্ষে? বিরোধী জোট ইউডিএফ আশা করছে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মনোভাব তাদের পক্ষে যাবে। এলডিএফ আত্মবিশ্বাসী, উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক প্রকল্পের ধারাবাহিকতা মানুষকে আবারও তাদের পাশে।