আজকাল ওয়েবডেস্ক: বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে পশ্চিম এশিয়া এখন কার্যত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাত, আর অন্যদিকে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে চলা অস্থিরতা—সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চরম অনিশ্চয়তার মুখে। এই ঘোরালো পরিস্থিতিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার এক কঙ্কালসার চেহারা সামনে এসেছে। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) বা আপদকালীন তেলের ভাণ্ডারে বর্তমানে যা মজুত আছে, তা দিয়ে বড়জোর ৬ দিন দেশের চাকা সচল রাখা সম্ভব।

ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে। এই বিপুল আমদানির একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ আসে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু সমুদ্রপথটি এখন যুদ্ধের কারণে কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার পথে। যদি কোনও  কারণে এই পথে তেলের জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়, তবে ভারতের অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন এক সংকটকালে দেশের আপদকালীন তেলের ভাণ্ডারগুলো পূর্ণ করার পরিবর্তে বাজেট বরাদ্দ উল্টে কমিয়ে দিয়েছে কেন্দ্র।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালোর এবং পাদুর- এই তিনটি জায়গায় ভূগর্ভস্থ বিশাল তেলের গুদাম বা রিজার্ভ রয়েছে। এগুলি যদি পুরোপুরি ভর্তি থাকে, তবে দেশের সাড়ে ৯ দিনের তেলের চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিমন্ত্রী সুরেশ গোপী রাজ্যসভায় এক লিখিত জবাবে জানিয়েছেন, বর্তমানে এই ভাণ্ডারগুলোতে ধারণক্ষমতার মাত্র ৬৪ শতাংশ তেল মজুত আছে। অর্থাৎ ৩.৩৭২ মিলিয়ন টন তেল এখন সরকারের হাতে রয়েছে, যা বর্তমান ব্যবহারের নিরিখে মাত্র ৬ দিনের জন্য যথেষ্ট। ইন্ডিয়া টুডে-র এক আরটিআই (RTI) রিপোর্টেও এই তথ্যের সত্যতা মিলেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার না হওয়ায় ভারতের প্রকৃত সুরক্ষা কবচ এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো কেন্দ্রীয় বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ ছাঁটাই। চলতি অর্থবর্ষে যেখানে এই কৌশলগত ভাণ্ডার পূর্ণ ও সম্প্রসারিত করার জন্য ৫,৮৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, সরকার সেখানে খরচ করতে চলেছে মাত্র ১,০৩৯ কোটি টাকা। এমনকি আগামী অর্থবর্ষের জন্য এই বরাদ্দ কমিয়ে মাত্র ২০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যেকোনও  মুহূর্তে আকাশছোঁয়া হতে পারে, সেখানে কেন এই ব্যয়সংকোচ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে ভারতের এই ৬ দিনের ‘লাইফলাইন’ কি দেশের কোটি কোটি মানুষের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারবে? হরমুজ প্রণালীর সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দেশের বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে এখন থেকেই আশঙ্কার মেঘ ঘনাচ্ছে।