আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতে অবশেষে শুরু হয়েছে মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)–এর বিরুদ্ধে টিকাকরণ কর্মসূচি। কিন্তু এই কর্মসূচি চালু হতে যে আট বছর সময় লেগেছে, তার মধ্যে আনুমানিক লক্ষাধিক ভারতীয় মহিলা জরায়ুমুখের ক্যানসারে প্রাণ হারিয়েছেন—এমনই আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।

Cervical cancer ভারতে মহিলাদের অন্যতম প্রাণঘাতী রোগ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ৭৭ হাজার ভারতীয় মহিলা এই রোগে মারা যান। এই রোগের প্রধান কারণ Human Papillomavirus (HPV) সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ২০১৮ সালেই এই টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হতো, তাহলে যেসব কিশোরী তখন টিকা নেওয়ার বয়সে ছিল কিন্তু এখন আর নেই, তাদের অনেককেই ভবিষ্যতের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত করা যেত। ২০১৮ সালে ভারতের সর্বোচ্চ টিকানীতি নির্ধারণকারী সংস্থা National Technical Advisory Group on Immunisation (NTAGI) সুপারিশ করেছিল যে HPV টিকাকে Universal Immunisation Programme (UIP)–এর অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কিন্তু তখন দুটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—একটি ছিল টিকার দাম, অন্যটি ছিল জাতীয় স্তরে প্রমাণের অভাব  এবং বাস্তবায়নের জটিলতা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এক প্রাক্তন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সেই সময়ে মূল উদ্বেগ ছিল বহুজাতিক কোম্পানির তৈরি টিকার অত্যন্ত বেশি দাম। সরকারের ধারণা ছিল, যদি দেশীয় কোনও টিকা তৈরি হয় তাহলে খরচ অনেক কমবে। সেই কারণেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অপেক্ষা করার। এই আশা অমূলক ছিল না। ২০২২ সালে ভারতেই তৈরি HPV টিকা Cervavac বাজারে আনে Serum Institute of India। সেই সময় এটিকে “মেড ইন ইন্ডিয়া” সাফল্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে অন্য একটি টিকা দিয়ে—Gardasil, যা তৈরি করে Merck Sharp & Dohme (MSD)।

&t=1s

এই কর্মসূচির জন্য ২.৬ কোটি ডোজ গার্ডাসিল সংগ্রহ করা হয়েছে, যার অর্থ সাহায্য করছে Gavi, the Vaccine Alliance। ফলে “স্বদেশি” টিকার অপেক্ষায় এতদিন কর্মসূচি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত এখন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—শেষ পর্যন্ত যখন কর্মসূচি শুরু হল, তখন কেন ভারতীয় টিকার বদলে বিদেশি টিকা ব্যবহার করা হল? HPV টিকা নিয়ে ভারতের বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে একটি ট্রায়ালের সময় নয়জন কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনা বড় বিতর্ক তৈরি করেছিল। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, অধিকাংশ মৃত্যুর সঙ্গে টিকার সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। তবু সেই ঘটনার পর টিকাটি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক সন্দেহ তৈরি হয়।

এছাড়াও একটি বড় আপত্তি এসেছিল স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে। সংগঠনের নেতা অশ্বিনী মহাজন ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে HPV টিকাকে UIP–এ অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেন। তিনি দাবি করেছিলেন, এই টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ আছে এবং এটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমিত সম্পদ অন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থেকে সরিয়ে দেবে। এই সব বিতর্কের মধ্যেই বছরের পর বছর সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে। যদিও ২০১৫ সালেই Gavi, the Vaccine Alliance ভারতের বিভিন্ন টিকাকরণ প্রকল্পের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার মধ্যে HPV কর্মসূচিও ছিল।

বর্তমান কর্মসূচির আরেকটি বিশেষ দিক হল ডোজের সংখ্যা। সাধারণত HPV টিকা দুই ডোজে দেওয়া হয়। কিন্তু ভারতে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের একটি মাত্র ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও বিশ্বের কোথাও HPV টিকা আনুষ্ঠানিকভাবে এক ডোজের জন্য বিক্রি  করা হয় না। এই বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছে Indian Council of Medical Research (ICMR)। তবে সেই গবেষণার ফলাফল আসতে আরও কয়েক বছর লাগবে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে NTAGI–এর বৈঠকেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

সরকার অবশ্য তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে World Health Organization–এর সুপারিশের কথা উল্লেখ করেছে। ২০২২ সালে WHO–র বিশেষজ্ঞ কমিটি জানায়, একটি মাত্র ডোজও দুই ডোজের মতো সুরক্ষা দিতে পারে এবং এটি কর্মসূচি বাস্তবায়নে সুবিধাজনক হতে পারে। সরকারি সূত্রের মতে, প্রথম পর্যায়ে ২.৬ কোটি গার্ডাসিল ডোজ ব্যবহার করে তিন বছর ধরে এই কর্মসূচি চালানো সম্ভব। প্রতি বছর প্রায় ১.১২ কোটি কিশোরী ১৪ বছরে পা দেয়, যাদের লক্ষ্য করে এই টিকা দেওয়া হবে।

একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু এই টিকা সহজলভ্য ছিল এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া গেছে, তাই কর্মসূচি শুরু করার সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না বলে মনে হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশীয় এক-ডোজ টিকা তৈরি হলে তখন পরবর্তী পর্যায়ের পরিকল্পনা করা হবে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আট বছরের এই বিলম্ব ভারতের টিকানীতির একটি জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছে—যেখানে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, অর্থনৈতিক হিসাব, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সামাজিক বিতর্ক—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আর সেই সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মহিলা এমন একটি রোগে প্রাণ হারান, যা প্রতিরোধযোগ্য বলে বহু গবেষণায় প্রমাণিত।