আজকাল ওয়েবডেস্ক: বৃহস্পতিবার লোকসভায় নারী সংরক্ষণ বিল প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, বাস্তবতা হল, এই বিষয়টি কেবল নারী সংরক্ষণ বিল সংক্রান্ত নয়, বরং এটি নারীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং নারী ক্ষমতায়নের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার বিষয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, নারীদের জন্য কোটা বা সংরক্ষণের ধারণার একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। তিনি এর প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণের কৃতিত্ব মতিলাল নেহরুকে দিয়েছেন।
নারী সংরক্ষণ নিয়ে যখন দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে, তখনই ওয়ানাড়ের সাংসদ এই মন্তব্য করলেন। এই বিতর্কের মাঝেই তিনি প্রধানমন্ত্রী ও শাসক দলের সাংসদদের রাজনৈতিক কৃতিত্বের দাবি সংক্রান্ত বিভিন্ন বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেন যে, "নারী সংরক্ষণ বিলের পক্ষে যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, তা কেবল কোনও একটি নির্দিষ্ট দলের একক উদ্যোগের ফসল নয়।"
কেন্দ্রীয় সরকারকে কটাক্ষ করে প্রিয়াঙ্কা বলেন, "প্রধানমন্ত্রী মোদি যতই দাবি করুন না কেন যে তিনি এর কোনও কৃতিত্ব চান না, নারীদের কিন্তু বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, এই বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক দাবির ঊর্ধ্বে।" পাশাপাশি তিনি এই বিলের নেপথ্যে থাকা সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আরও জানান যে, রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে নারী সংরক্ষণ বিলটিকে বাস্তবায়িত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, এর আগেও সোনিয়া গান্ধী এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে এই বিলটি পাশের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, নারী সংরক্ষণ বিল ২০১০ সালে রাজ্যসভায় পাশ হলেও লোকসভায় তা অনুমোদন পায়নি।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, "২০১০ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এবং ইউপিএ চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস দল আবারও লোকসভা ও বিধানসভাগুলোতে নারীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এমনকি রাজ্যসভায় বিলটি পাসও হয়েছিল, কিন্তু লোকসভায় এ বিষয়ে সর্বসম্মত ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী মোদীকে একটি চিঠি লিখে প্রস্তাব দেন যে, ২০১৯ সালের মধ্যেই এই নারী সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করা উচিত। আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রকাশ্যে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে উপহাস করেন, কিন্তু নিজের বাসভবনে ফিরে গিয়ে তিনি ঠিকই রাহুলের কথাগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন।"
"৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের বিধান প্রথম চালু করেছিল কংগ্রেস"
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, "পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলোতে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের বিধানটি সর্বপ্রথম এই সংসদে উত্থাপন করেছিল প্রয়াত রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে গঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকার।" তিনি আরও বলেন, "আমি এই বিষয়ে কিছুটা প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে চাই। কারণ প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় এ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। কে এটি আটকে দিয়েছিল, কীভাবে এটি থামানো হয়েছিল এবং কীভাবে এই সিদ্ধান্তটি ৩০ বছর ধরে ঝুলে ছিল। ক্ষমতাসীন দলের আমার সহকর্মীরা হয়তো এটি পছন্দ করবেন না, তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হল - এর সূচনা করেছিলেন 'নেহরু' নামের এক ব্যক্তি। তবে চিন্তার কিছু নেই; ইনি সেই নেহরু নন যাঁর নাম শুনলেই আপনারা এত কুণ্ঠাবোধ করেন। তাঁর বাবা, মতিলাল নেহরু, ১৯২৮ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং তা কংগ্রেস দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সামনে পেশ করেন। সেই প্রতিবেদনে তিনি ১৯টি মৌলিক অধিকারের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ১৯৩১ সালে, সর্দার প্যাটেলের সভাপতিত্বে করাচিতে কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেই করাচি অধিবেশনেই এই প্রস্তাবটি পাশ হয়, যার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের রাজনীতিতে নারীর সমান অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সূচনা ঘটে। একই সময়ে, আমাদের রাজনীতিতে 'এক ভোট, এক নাগরিক, এক মূল্য' - এই নীতিটিও প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতেও এই অধিকারটি পাওয়ার জন্য মানুষকে ১৫০ বছর ধরে অপেক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয়েছিল। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নারীর জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করা ছিল বিশ্ব প্রেক্ষাপটে একটি অনন্য পদক্ষেপ।"
"প্রধানমন্ত্রী মোদি বিরোধিতার কথা বলেছেন, কিন্তু কারা বিরোধিতা করেছিল তা নির্দিষ্ট করে বলেননি"
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি সংসদে বলেছেন যে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়েছিল, কিন্তু কারা আসলে এর বিরোধিতা করেছিল, তা তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি।" তিনি বলেন, "প্রকৃতপক্ষে, আপনারাই - অর্থাৎ বিজেপি-ই নারী সংরক্ষণের বিরোধিতা করেছিল। এর কয়েক বছর পর, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাও-এর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার সংসদে এই আইনটি পাশ করে এবং তা কার্যকর করে।"
প্রিয়াঙ্কার মন্তব্যে মুচকি হাসছিলেন অমিত শাহ, কিরেন রিজিজুরা। যা দেখে কংগ্রেস সাংসদ চটপটে ভঙ্গিতে বলেন, "আপনারা সবাই পূর্ণ পরিকল্পনা নিয়েই এসেছেন। আজ চাণক্য যদি জীবিত থাকতেন, তবে তিনিও আপনাদের ধূর্ততা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যেতেন।"
















