আজকাল ওয়েবডেসেস্ক: রবিবারই বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগের খবর সামনে এসেছে। যা নিয়ে তুঙ্গে আলোচনা। কেন হঠাৎ দীনেশকে পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশে? কারণ, কয়েক দশকের পুরনো প্রথা অনুসারে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে পেশাদার কূটনীতিকদেরই নিয়োগ করার প্রথা চলে আসছে। কিন্তু, দীনেশকে নিয়োগের মাধ্যমে সেই প্রথা ভেঙে ফেলা হল।
এর আগেও কি এমন ঘটনা ঘটেছে? কেন এই ব্যতিক্রম? এর তাৎপর্যই বা কী?
কে এই দীনেশ ত্রিবেদী?
দীনেশ ত্রিবেদী একজন প্রবীণ ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, যাঁকে সম্প্রতি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ। ফলে সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তাঁর সুগভীর বোঝাপড়া রয়েছে। যা ঢাকার বর্তমান সংবেদনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বলে মনে করা হচ্ছে।
তিন দশকেরও বেশি দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ভারতের বেশ কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২১ সালের মার্চ মাস থেকে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন সদস্য।
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে (১৯৯৮-২০২১ সময়কালে) দীনেশ ত্রিবেদী তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। জোড়-াফুল প্রতীকে তিনি বেশ কয়েকবার ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতে সাংসদ ও মন্ত্রী হয়েছিলেন। উনিশের ভোটে পরাজিত হলে তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠায় তৃণমূল। মমতা ব্যানার্জির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। তবে, নেত্রীর সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে ঘাস-ফুল ছেড়ে পদ্ম ফুলে যোগ দেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ।
এর আগে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দীনেশ ত্রিবেদী ছিলেন জনতা দলের সদস্য। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্ত ছিলেন কংগ্রেসের সঙ্গে।
দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের সংসদের উভয় কক্ষে, অর্থাৎ লোকসভা (ব্যারাকপুর কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করে, ২০০৯-২০১৯) এবং রাজ্যসভার (১৯৯০-৯৬, ২০০২-০৮, ২০২০-২১) সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দীনেশ ত্রিবেদীর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিপদসমূহ:
কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী (২০১১–২০১২): ২০১২ সালের রেল বাজেটের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। সেই বাজেটে তিনি রেলযাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিকাঠামোর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে যাত্রীবাহী ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলেন। এই প্রস্তাবের জেরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য ও বিরোধ দেখা দেয়, যার পরিণতি হিসেবে শেষমেশ তাঁকে মন্ত্রিপদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী (২০০৯–২০১১): তিনি ইউপিএ সরকারের অধীনে এই মন্ত্রিপদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ কেন অনন্য?
যদিও ভারত মাঝে মাঝে আমেরিকা বা ব্রিটেনের মতো দেশগুলোতে বিভিন্ন পদের জন্য রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ করে থাকে, তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর পদগুলো প্রায় একচেটিয়াভাবে সিনিয়র আইএফএসআধিকারিকদেরই এখতিয়ার হিসেবে গণ্য হয়ে এসেছে।
সাধারণত, প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের দূত বা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের পেশাদার কর্তারা।
গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কোনও প্রতিবেশী দেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনের প্রধান হিসেবে একজন রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিকে পাঠান হল।
এমন ঘটনা কি আগেও ঘটেছে?
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার কোনও প্রতিবেশী দেশে সর্বশেষ বড় ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগ হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে। সেবার ইতিহাসবিদ বিমল প্রসাদকে নেপালে পাঠানো হয়েছিল।
দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন বেছে নেওয়া হল?
ঢাকায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে, বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত 'পুনঃবিন্যাস' হিসেবে দেখছেন।
* একজন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যকে এই দায়িত্বে পাঠানোটা এই ইঙ্গিত বহন করে যে, সংবেদনশীল আঞ্চলিক কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি এখন প্রথাগত আমলাতন্ত্রের চেয়ে "রাজনৈতিক প্রভাব" বা গুরুত্বকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
* দীনেশ ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গের একজন বিশিষ্ট নেতা এবং তিনি বাংলা ভাষায় অত্যন্ত পারদর্শী। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যকার অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বন্ধন সম্পর্কে তাঁর গভীর বোঝাপড়াকে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি জটিল সময়ে এই পদক্ষেপ করা হল - যে সময়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদায় ঘটেছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অধীনে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই নিয়োগটি আসায়, এটিকে একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে; যা আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতিতে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিবেদীর এই নিয়োগটি একটি সংবেদনশীল প্রতিবেশী সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে "সরাসরি ও সক্রিয়" রাজনৈতিক কূটনীতির দিকে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেরই প্রতিফলন, যে সম্পর্কটি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছুটা চাপের মুখে পড়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি:
* তাঁর এই নিয়োগটি কেন অস্বাভাবিক?
ভারত সাধারণত প্রতিবেশী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের পেশাদার কূটনীতিকদেরই পাঠিয়ে থাকে। দীনেশ ত্রিবেদী একজন রাজনীতিবিদ, কোনও প্রশিক্ষিত কূটনীতিক নন। আর ঠিক এই কারণেই তাঁর নিয়োগটি প্রচলিত প্রথার একটি ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি সংবেদনশীল কূটনৈতিক মিশনের ক্ষেত্রে।
* বাংলাদেশের পদটিকে কেন একটি সংবেদনশীল দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়?
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত রয়েছে। যেমন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিবাসন, নদী-জলের ভাগাভাগি (যেমন - তিস্তা নদীর জলবণ্টন), বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা। এই বিষয়গুলো সামলানোর জন্য সাধারণত অভিজ্ঞ কূটনৈতিক দক্ষতা ও ধারাবাহিকতার প্রয়োজন হয়। আর ঠিক এই কারণেই আইএফএস-বহির্ভূত বা পেশাদার কূটনীতিক নন এমন ব্যক্তিদের হাতে সচরাচর এই ধরনের পদের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় না।
* রাজনৈতিকভাবে মনোনীত কাউকে কেন বিবেচনা করা হয়?
একজন বিশ্বস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ সমর্থনের ইঙ্গিত দিতে পারেন এবং কৌশলগত বার্তা ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারেন। যেসব পর্যায়ে কারিগরি আলোচনার মতোই রাজনৈতিক সংকেতের গুরুত্ব অপরিসীম, সেসব ক্ষেত্রে সরকার অনেক সময় প্রথাগত কূটনৈতিকের চেয়ে ‘বিশ্বাস’-কেই অধিক অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।















