আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৫ সালে উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলায় ভয়াবহ বন্যা হয়। এই বন্যা নিয়ে প্রথমে নানা ধারণা সামনে এসেছিল। কেউ বলেছিলেন এটি মেঘভাঙা বৃষ্টির ফল। আবার কেউ বা বলেছিলেন হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যা নেমেছিল। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় সামনে এল অন্য তথ্য।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য সূত্র অনুযায়ী, ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো জানিয়েছে, বরফের একটি বড় স্তর হঠাৎ ধসে পড়ায় এই বন্যা হয়েছিল।
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট উত্তরকাশীর ধারালি গ্রামে ভয়াবহ জলস্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে জল, কাদা ও পাথরের স্রোতে গ্রামটি কার্যত ভেসে গিয়েছিল। অনেক বাড়ি ভেঙে যায়। হোটেল ধসে পড়ে। ধ্বংস হয় খির গদ নামের ছোট নদীর ধারের বাজার।
ভাগীরথী নদীর তীরে ধারালি গ্রামটি অবস্থিত। এই গ্রামের উপরে শ্রীকান্ত হিমবাহ থেকে নেমে এসেছে খির গদ নামের একটি ছোট নদী। পাহাড়ি সরু উপত্যকায় গ্রামটি হওয়ায় বিপদের ঝুঁকি বেশি।
বন্যার সময় স্থানীয় মানুষ সেই বন্যার ভয়াবহতার ভিডিও করেন। আচমকা বিশাল জলস্রোত নেমে আসে। সেই জলের সঙ্গে ছিল পাথর, কাদা ও বরফ। স্রোতের প্রথম ধাক্কাটি ভীষণ শক্তিশালী ছিল। তারপরের কয়েক ঘণ্টা ধরে ধীর গতিতে কাদামাটির জল নামতে থাকে।
এই ঘটনার ধরন দেখে বিজ্ঞানীদের সন্দেহ হয়। কারণ মেঘভাঙা বৃষ্টি হলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবল বৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেনি। বরং, হিমবাহের হ্রদ ভেঙে গেলে বিশাল পরিমাণ জল বের হয়। সাথে বিশাল পরিমাণে কাদামাটি থাকে না। কিন্তু, ধারালির ঘটনায় সেই দুটি লক্ষণই দেখা যায়নি। তাই বিজ্ঞানীদের ভুরু কুঁচকায়।
ইসরোর বিজ্ঞানীরা ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের বৃষ্টির তথ্য পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, ঘটনার আগে ওই এলাকায় বৃষ্টি খুব বেশি ছিল না। হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হয়েছিল। তাই মেঘভাঙা বৃষ্টির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় সহজে। এর পরে বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করেন। ধারালির উপরের এলাকায় কোনও হিমবাহ হ্রদ নেই বলেও নিশ্চিত হন। ফলে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যা নামার সম্ভাবনাও বাতিল হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত গবেষণায় নতুন কারণ সামনে আসে। শ্রীকান্ত হিমবাহের নীচে প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায় একটি ঢালে বড় একটি বরফস্তর ছিল। স্তরটি বহু বছর ধরে সেখানে জমে ছিল। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, সেই বরফস্তরের উপরকার তুষারের আবরণ সরে গিয়েছে। গত ১৫ বছরে প্রথম এমনটা হল।
জলবায়ুতে উষ্ণতা বারার ফলে বরফের বাঁধুনি আলগা হয়। এবং হঠাৎ করে বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। বরফ ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জল, বরফ ও পাথর দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। পাহাড়ের ঢাল খুব খাড়া থাকায়, প্রায় ৩০ ডিগ্রি ঢাল বেয়ে এই ধ্বংসস্তূপ দ্রুত নীচে নামে। পথে নামতে নামতে সঙ্গী হয় পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ। ফলে ছোট একটি বরফধস ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মক স্রোতে পরিণত হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই স্রোত ধারালি গ্রামে পৌঁছে যায়।
বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ঘটনা হিমালয়ের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে। তুষাররেখাও পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক জায়গায় আলগা বরফস্তর তৈরি হচ্ছে। এই ধরনের বরফস্তর যে কোনও সময় ধসে পড়তে পারে। সচেতন না হলে, যখন তখন এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে আরও।
তবে আশার কথা এই যে, বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এই ধরনের বিপজ্জনক বরফস্তর আগে থেকেই দেখা সম্ভব। নিয়মিত নজরদারি করলে ভবিষ্যতে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া যেতে পারে।
